আলজাজিরার বিশ্লেষণ : হাদির মৃত্যুতে কেন উত্তাল বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান হাদি সিঙ্গাপুরের জেনারেল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যুতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে

2025-12-19T22:24:52+00:00
2025-12-19T22:24:52+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আলজাজিরার বিশ্লেষণ : হাদির মৃত্যুতে কেন উত্তাল বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:২৪ পিএম   (ভিজিট : ৮১৫)
শহিদ শরিফ ওসমান হাদি। ছবি : সংগৃহীত
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান হাদি সিঙ্গাপুরের জেনারেল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যুতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে উত্তাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঢাকা-৮ আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে লড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ওই আসনে নিজের নির্বাচনি গণসংযোগ থেকে ফেরার পথে গত ১২ ডিসেম্বর দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন হাদি। 

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ঘটনার পরপরই দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও তরুণ নেতা হাদির মৃত্যুতে সারা বাংলাদেশে কেন এত উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা নিয়ে এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।   

কে ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি?

৩২ বছর বয়সী হাদি বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতা। তিনি ইনকিলাব মঞ্চ বা ‘বিপ্লবের প্ল্যাটফর্ম’ এর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে লড়ার পরিকল্পনা করছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। হাদি সেই ভারতের আধিপত্যবাদবিরোধী একজন কট্টর সমালোচক ছিলেন বলে জানা যায়।

কোথায়, কখন এবং কীভাবে হাদি মারা যান?

গতকাল বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুর হাসপাতাল ও সরকার এবং ইনকিলাব মঞ্চ হাদির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনি গণসংযোগ থেকে ফেরার পথে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন হাদি। এরপর তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে গেলে উন্নিত চিকিৎসার জন্য  তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। 


১২ ডিসেম্বর নির্বাচনি এলাকা বিজয় নগরে নিজের নির্বাচনি গণসংযোগ শেষে রিকশা করে ফিরছিলেন হাদি। ওই সময় দুই  মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্ত তার মাথায় গুলি করে। গত ১৫ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জিকাল ইনটেনসিভ কেয়ার (আইসিইউ) বিভাগে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

গতকাল রাত ১০টার দিকে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ... মাথায় মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার কারণে হাদি মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে এক ফেসবুক পোস্টে তার পরিচালিত ইনকিলাব মঞ্চও মৃত্যুর বিষয়টি ঘোষণা করে। ইনকিলাব মঞ্চ তাদের ঘোষণায় জানায়, ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে আল্লাহ শহিদ হিসেবে কবুল করেছেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ সুজন আলজাজিরাকে  জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে পৌঁছানোর প্রত্যাশায় হাদির মরদেহের অপেক্ষায় শোকসন্তপ্তদের দল জড়ো হতে শুরু করে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

বাংলাদেশ পুলিশ হাদিকে গুলি করা হামলাকারীদের সন্ধানে তদন্ত শুরু করে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এই অভিযানে যুক্ত।

গত ১৩ ডিসেম্বর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজের স্থিরচিত্র প্রকাশ করে। যেখানে দুজন মূল সন্দেহভাজনকে দেখানো হয়েছে। পুলিশ তাদের গ্রেফতারের তথ্যের জন্য ৫০ লাখ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করে। সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, দু’জনের গায়ে ছিল কালো কাপড় এবং চোখে চশমা। একজনের গায়ে কালো হুডি, অন্যজন কালো শার্ট এবং হাতে ছিল রিস্টওয়াচ।


বাংলাদেশি গণমাধ্যমের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, দেশটির পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিপি) এ পর্যন্ত এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কমপক্ষে ২০ জনকে গ্রেফতার করেছে, তদন্তও চলছে।

রাজনৈতিক নেতাদের কী প্রতিক্রিয়া?

দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস তার শোক প্রকাশ করেছেন এবং হাদির মৃত্যুকে ‘জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ভয়, সন্ত্রাস বা রক্তপাতের মাধ্যমে গণতন্ত্রের দিকে দেশের অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না। 

জুমার নামাজ শেষে মসজিদে বিশেষ নামাজ ও শনিবার অর্ধদিনের শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।


স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) বলেছে, তারা হাদির মৃত্যুতে ‘গভীরভাবে শোকাহত’ এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানায়।

হাদির মৃত্যুতে বিক্ষোভকারীরা কীভাবে সাড়া দিয়েছে?

হাদীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং শুক্রবারও চলছে।

হাদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রধানদের পদত্যাগ দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা। অভিযুক্তদের ফেরত পাঠানোর দাবিও তারা দাবি জানিয়েছে, তাদের অনেকের হলো, তারা ভারতে পালিয়ে গেছে।

আলজাজিরার সাংবাদিক তানভীর চৌধুরী বলেন, আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। এছাড়া সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে রয়েছে। কিছু রাজনৈতিক দলের অংশও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের মূল স্লোগান হচ্ছে ওসমান হাদি হত্যার ‘ন্যায়বিচার চাই’। অভিযুক্তদের যত দ্রুত সম্ভব বিচারের আওতায় আনতে হবে, অন্যথায় তারা প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে।


রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয় একদল নেতাকর্মী। এরপর তারা ভবনে ঢুকে পড়েন বলে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের অনলাইন পোর্টাল জানিয়েছে।

এছাড়া বিক্ষোভকারীদের আরও একটি দল ডেইলি স্টার প্রাঙ্গণে ধাক্কা দেয় এবং ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে,  তাদের ২৮ জন সাংবাদিক এবং কর্মী চার ঘন্টা ধরে জ্বলন্ত ভবনে আটকা পড়েছিলেন। 

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দুটি ভবনের বাইরে সেনা ও আধাসামরিক সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে আলজাজিরা জানায়, বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশন লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীরা।

২০২৪ এর অভ্যুতথান

২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীরা প্রচলিত চাকরি কোটা সিস্টেমের বৈষম্যের প্রতিবাদে করতে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ বেড়ে যাওয়ায় শেখ হাসিনা দমন-পীড়নের নির্দেশ দেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সেখানে নির্বাসনে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) অনুসারে, প্রায় ১৪শ মানুষ এই আন্দোলনে নিহত হয়। এছাড়া ২০ হাজারের বেশি বেশি আহত হয়।

চলতি বছরের আলজাজিরার তদন্ত বিভাগের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, বাংলাদেশের সাবেক এই নেতা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

গত মাসে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ঢাকার ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিচারের মুখোমুখি হতে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারত এখন পর্যন্ত রাজি হয়নি।

হাদির মৃত্যুতে ভারতের প্রতি ক্ষোভ কেন?

হাদির মৃত্যু ঘিরে শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ চলে। বিক্ষোভ সমাবেশস্থল থেকে আলজাজিরার এক সাংবাদিক চৌধুরী জানান, ভিড়ের মধ্যে প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। তারা বলছেন, ভারত সব সময় বাংলাদেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। বিশেষ করে নির্বাচনের ঠিক আগে শেখ হাসিনা ভারত থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। অধিকাংশ বিক্ষাভকারীদের মতে, হাদির ওপর হামলাকারীরা ভারতে পালিয়ে গেছে।

এনসিপি নেতা সারজিস আলম বলেন, হাদি ভাইয়ের হত্যাকারীদের ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশন বন্ধ রাখবে। আমরা একটা যুদ্ধে আছি!


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির নেতা নাদিম হাওলাদার আলজাজিরাকে বলেন, ভিন্নমতকে স্তব্ধ করার জন্য হাদিকে ‘নৃশংসভাবে হত্যা’ করা হয়েছে। আমরা তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে এসেছি এবং এই ঘটনাকে আমরা ভারতীয় আগ্রাসন হিসেবে দেখছি।

তিনি অভিযোগ করেন, ভারত ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশের উপর অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তার করেছে। নয়াদিল্লি গত ১৭ বছরে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং হত্যাকাণ্ডমূলক শাসনকে সমর্থন করেছে বলে অভিযোগ তার। 

হাওলাদার আরও বলেন, অপরাধীরা ভারতে পালিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা ও হাদি হত্যাকাণ্ডে দায়ী সবাইকে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে।

সময়ের আলো/এসকে/ 


  বিষয়:   আলজাজিরা  হাদি  মৃত্যু  বাংলাদেশ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: