ইসরাইলি দখলদারিত্বে অস্তিত্ব সংকটের মুখে খ্রিস্টানরাও

সময়ের আলো ডেস্ক

বিদেশ

বড়দিন তথা ক্রিসমাসের সময় বেথলেহেমের ম্যাঞ্জার স্কয়ারে দোকানিদের ব্যস্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু যিশুর জন্মস্থান আজ প্রায় জনশূন্য।একসময় যে চত্বর

2025-12-25T03:16:40+00:00
2025-12-25T03:16:40+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
বিদেশ
ইসরাইলি দখলদারিত্বে অস্তিত্ব সংকটের মুখে খ্রিস্টানরাও
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:১৬ এএম   (ভিজিট : ১৪৮)
বড়দিনের আগের দিনও উৎসবের আমেজে নেই বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান শিশুরা। অস্থায়ী তাঁবুতে তীব্র ঠান্ডায় বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তারা। বুধবার গাজা সিটি থেকে তোলা। ছবি : আলজাজিরা
বড়দিন তথা ক্রিসমাসের সময় বেথলেহেমের ম্যাঞ্জার স্কয়ারে দোকানিদের ব্যস্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু যিশুর জন্মস্থান আজ প্রায় জনশূন্য। 

একসময় যে চত্বর ছিল উৎসবের প্রাণকেন্দ্র, এখন সেখানে নীরবতা আর বন্ধ দোকানের সারি। বহু প্রজন্ম ধরে ক্রিসমাসই ছিল জিয়াকামান পরিবারের জীবিকার মূল ভরসা। তাদের মালিকানাধীন ‘ক্রিসমাস হাউস’ বেথলেহেমের ম্যাঞ্জার স্কয়ারের অন্যতম প্রধান দোকান। এখানে স্থানীয় জলপাই কাঠে তৈরি যিশুর জন্মদৃশ্যের মূর্তি, অলংকার, জপমালা, ক্রুশসহ নানা ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রি হতো। কিন্তু গত দুই বছর ধরে দোকানটির দরজা বন্ধ। 

পরিবারের ব্যবসা দেখভাল করা জ্যাক ইসা জিয়াকামান বলেন, চারপাশে কাউকে দেখা যায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসরাইল গত কয়েক বছরে বেথলেহেমকে একটা বড় কারাগারে পরিণত করেছে। ক্রিসমাসের ঠিক আগে ম্যাঞ্জার স্কয়ার প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে। লাল-সোনালি বল দিয়ে সাজানো ক্রিসমাস ট্রির সামনে হাতে গোনা কয়েকজন স্থানীয় মানুষ ছবি তোলে। ন্যাটিভিটি চার্চের সামনে দোকানগুলো বন্ধ, পর্যটক না থাকায় ট্যুর গাইডরা কাজের আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন। মিডল ইস্ট আই।

আরেক দোকানি আসাদ জাকামান বলেন, প্রতি শনিবার কিছু ফিলিপিনো আর ভারতীয় নারী-পুরুষ আসে, তারা ইসরাইলে কাজ করে। কিন্তু তাতে কিছুই হয় না। সব বন্ধ। কেন খুলব? কেউই তো আসছে না। কখনো কখনো বিরক্তি কাটাতে দোকান খুলি। 

করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে বেথলেহেম যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও গভীর অস্তিত্বগত বিপদ। ইসরাইল ও দখলকৃত পশ্চিম তীরের মাঝের দেয়ালের গায়ে ঠেসে থাকা বেথলেহেম চারদিক থেকে বসতি, চেকপয়েন্ট ও নিরাপত্তা গেটের জালে বন্দি। খ্রিস্টান ও ফিলিস্তিনি পরিচয় দুটিই সেখানে ক্রমশ শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠছে। 

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় বেথলেহেম গভর্নরেটের জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ ছিল খ্রিস্টান। ২০১৭ সালে তা নেমে আসে প্রায় ১০ শতাংশে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের হাতে। এরপর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি দ্রুততর হয়। করোনার ধাক্কার পর গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে দমন-পীড়ন সেই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। 

দীর্ঘদিনের ধর্মযাজক রেভারেন্ড মুন্থার আইজাক বলেন, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আমরা আরেকটি পরিবারের বিদায় দেখি। খ্রিস্টান পরিবারগুলো চলে যাচ্ছে। মানুষ নিজের ভূখণ্ডে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছে।

রোববার স্মোটরিচ পশ্চিম তীরে ১৯টি অবৈধ বসতি বৈধ করার ঘোষণা দেন। এর মধ্যে রয়েছে বেথলেহেমের পূর্বে বেইত সাহুর গ্রামে অবস্থিত ইয়াতজিভ নামের একটি বসতি পশ্চিম তীরের হাতে গোনা কয়েকটি খ্রিস্টান জনপদের একটি। গত মাসেই সেখানে বুলডোজার ঢোকে। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 

মানবাধিকারকর্মী ডালিয়া কুমসিয়াহ বলেন, এটা ভয়ের অনুভূতি। গভীর শোক আর ক্ষত। আমরা আমাদের জমি হারাচ্ছি এটা কল্পনাও করা যায় না।

বাইবেলের কাহিনি অনুযায়ী, বেইত সাহুর সেই স্থান যেখানে ফেরেশতারা রাখালদের কাছে যিশুর জন্মসংবাদ দিয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা জানে, বসতি স্থাপন মানে কী। জমি হারানো, আলাদা রাস্তা, কৃষকদের উৎখাত, সহিংসতা আর দৈনন্দিন ভয়। 

কুমসিয়াহ বলেন, শেফার্ডস ফিল্ড এখন দুই বসতির মাঝখানে আটকে গেছে। আমরা বন্দি। তার কথায়, আমাদের এই ভূমিতে আদিবাসী উপস্থিতিই হুমকির মুখে। পরিবার-পরিজন একে একে দেশ ছাড়ছে। এটাকে অভিবাসন বলা যায় না— এটা দখলদারিত্ব তৈরি করা এক জোরপূর্বক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া।

চলতি মাসের শুরুতে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো বেথলেহেমে ক্রিসমাস ট্রি জ্বালানোর অনুষ্ঠান হয়। 

মেয়র মাহের নিকোলা কানাওয়াতি বলেন, সেদিন আমরা আবার ক্রিসমাসের আবহ পেয়েছিলাম। এটা মানুষকে আশা দেয়। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। গত দুই বছরে শহরের ১০ শতাংশ মানুষ (প্রায় ৪ হাজার) চলে গেছে। পর্যটন বন্ধ, হোটেল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যত অচল। অনেকেই ব্যবসা বিক্রি করে শহর ছেড়েছে। 

জিয়াকামান বলেন, মিডিয়া দেখাতে চায় সব স্বাভাবিক। কিন্তু ৮০-৯০ শতাংশ হোটেল ফাঁকা। চেকপয়েন্ট ও গেটের কারণে আশপাশের গ্রামের ফিলিস্তিনিরাও শহরে আসতে ভয় পান। কখন গেট বন্ধ হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ডিসেম্বরের বেশিরভাগ সময় বেথলেহেমের প্রধান প্রবেশপথ চেকপয়েন্ট ৩০০ বন্ধ ছিল যা শহরের অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিয়েছে।

খ্রিস্টানদের জন্য হুমকি শুধু বেথলেহেমে নয়। বিচ্ছিন্নতা প্রাচীর বেথলেহেম ও জেরুজালেমের খ্রিস্টান সমাজের প্রায় ২ হাজার বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। পূর্ব জেরুজালেমের পুরোনো শহরের ভেতর খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থানগুলোতে চরমপন্থি বসতকারীদের হামলা, অপমান ও থুতু নিক্ষেপ নিয়মিত ঘটনা। আর্মেনীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বেড়েছে। দেয়ালে লেখা হচ্ছে, আরব ও তাদের আর্মেনীয় বন্ধুদের মৃত্যু হোক। যিশুর মূর্তিতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, গির্জার দেয়ালে হুমকিমূলক পোস্টার টাঙানো হয়েছে। 

সেভ দ্য আর্কিউর মুখপাত্র কেঘাম বালিয়ান বলেন, জেরুজালেমে খ্রিস্টানদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। আমরা একজোট না হলে হারিয়ে যাব।

নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিস্টানদের রক্ষক। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। সম্প্রতি ইসরাইল সরকার ব্যয় বহন করে খ্রিস্টান নেতাদের বড় একটি প্রতিনিধি দল আমন্ত্রণ জানালেও, ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের জীবন বাস্তবে আরও কঠিন হয়ে উঠছে। 

বেথলেহেমের মেয়র স্পষ্ট করে বলেন, খ্রিস্টানদের বেথলেহেম ছাড়তে বাধ্য করেছে দখলদারিত্ব। মুসলিম ও খ্রিস্টান— আমরা সবাই একই কষ্টের শিকার। 

ফাঁকা দোকানে দাঁড়িয়ে জিয়াকামান বলেন, সবাই খ্রিস্টানদের নিয়ে কথা বলে। কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকার খ্রিস্টানদের নীরবতাই আমাদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে। তার কণ্ঠে গভীর হতাশা। আমি আর কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। ২০ বছর পর হয়তো বেথলেহেমে এক-দুটি খ্রিস্টান পরিবার ছাড়া কেউ থাকবে না।

এফআর


  বিষয়:   ইসরাইলি দখলদারিত্বে  অস্তিত্ব সংকটের মুখে  খ্রিস্টানরা 


Loading...
Loading...
বিদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: