সংগৃহীত ছবিরুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে থাকা ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ যখন তীব্র শীতে জমে আছে, ঠিক তখনই রোববার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
এই সফর কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং রাশিয়ার পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তার মাঝেই। তা হলো শান্তি আলোচনা এগোলেও হামলা চলবেই। রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মাত্র দুই দিন আগে ঘোষিত এই বৈঠকের লক্ষ্য একটাই ট্রাম্প প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার ফাঁকফোকরগুলো মেরামত করা। শুরুতে ২৮ দফার যে পরিকল্পনা ট্রাম্প তুলে ধরেছিলেন, ইউক্রেন তা সংশোধন করে ২০ দফায় এনেছে। দুই পক্ষের মধ্যে গ্রহণযোগ্য একটি খসড়া চূড়ান্ত করতে মার্কিন দূতরা জোরালো কাজ চালাচ্ছেন। ডিসেম্বর ২০ থেকে ফ্লোরিডায় ছুটিতে থাকা ট্রাম্প এই আলোচনার জন্য বিরতি নিচ্ছেন।
জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের এই বৈঠকের পথ তৈরি হয় গত সপ্তাহে। সেদিন জেলেনস্কি এক ঘণ্টা ধরে ফোনালাপ করেন ট্রাম্পের পররাষ্ট্র দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে। কুশনার শান্তি চুক্তির কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজে যুক্ত। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তির কাছাকাছি না পৌঁছালে জেলেনস্কি বা ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অর্থবহ হবে না। সেই বক্তব্যই ইঙ্গিত দেয়, আলোচনা এখন কতটা এগিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তির প্রায় ৯০ শতাংশ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যা গত শুক্রবার নিজেও স্বীকার করেন জেলেনস্কি। সিএনএন।
তিনি বলেন, এটা সহজ নয়। কেউ বলছে না সবকিছু একবারেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিটি বৈঠক, প্রতিটি আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের লক্ষ্যের দিকে এগোতেই হবে। তবু বাকি ১০ শতাংশই সবচেয়ে কঠিন। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো ভূখণ্ড ছাড়।
প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইউক্রেনকে ভূমি ছাড় দিতে হতে পারে এই বাস্তবতা সামনে এসেছে। রাশিয়া এখনও তাদের সর্বোচ্চ দাবি থেকে সরে আসেনি; তারা পুরো পূর্ব দনবাস অঞ্চল চায়। জেলেনস্কি এখন পুরোপুরি ছাড়ের সম্ভাবনা নাকচ করছেন না। তিনি বলেছেন, রাশিয়া যদি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, তা হলে শান্তি পরিকল্পনাটি গণভোটে তোলা হতে পারে। ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের সীমান্ত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক।
এই অচলাবস্থা ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু ‘ভাবনার খোরাক জাগানো’ প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে একটি ‘অর্থনৈতিক মুক্ত অঞ্চল’ গঠনের ধারণা। আরেকটি বড় প্রশ্ন জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ।
ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই কেন্দ্রটি বর্তমানে রাশিয়ার দখলে। জেলেনস্কির প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন যৌথভাবে এটি পরিচালনা করবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের অর্ধেক যাবে ইউক্রেনে, বাকিটা যুক্তরাষ্ট্র বণ্টন করবে। রাশিয়া এই বৈঠকে উপস্থিত থাকছে না। ফলে মস্কো আদৌ তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বরাবরই শান্তির পথে ইউক্রেন ও রাশিয়া দুই পক্ষকেই বাধা হিসেবে দেখিয়েছেন।
বৈঠকের আগের দিন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, কিয়েভ যদি শান্তিপূর্ণ সমাধানে না আসে, তা হলে রাশিয়া সামরিক পথেই তাদের ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ সব লক্ষ্য পূরণ করবে। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস এমনটাই জানায়। এর মধ্যেই শনিবার ভোরে ইউক্রেনে রাশিয়া চালায় ভয়াবহ হামলা। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এক রাতেই ছোড়া হয় ৫১৯টি ড্রোন ও ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র। জেলেনস্কি বলেন, শান্তির কথা বললেও রাশিয়ার হামলাই তাদের আসল অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, টানা এক সপ্তাহের নিবিড় আলোচনার পর রোববারের বৈঠকটি ফলপ্রসূ হবে। যদিও নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য প্রকাশ করা হয়নি। জেলেনস্কির মূল লক্ষ্য যুদ্ধ শেষ করার একটি কাঠামো চূড়ান্ত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাওয়া, যাতে ভবিষ্যতে রাশিয়া আবার আগ্রাসন চালাতে না পারে।
এই ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে চলতি মাসে বার্লিনে ইউরোপ, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে দুই দিনের আলোচনা হয়। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো এই কাঠামোতে ভবিষ্যৎ রুশ আগ্রাসন ঠেকানো, নজরদারি ব্যবস্থা এবং চুক্তি ভঙ্গের পরিণতি স্পষ্ট করা হয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এটা এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা প্যাকেজ। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা বিস্তারিত বলা হয়নি। আরেক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প প্রয়োজনে এই নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কংগ্রেসে তুলতে রাজি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন তিনি মস্কোকে এই নিশ্চয়তা মেনে নিতে রাজি করাতে পারবেন। এমনকি শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিষয়ে রাশিয়া নীতিগতভাবে আপত্তিহীন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে। এই বৈঠকে কোনো ইউরোপীয় নেতা থাকছেন না। আগের কিছু বৈঠকে যেখানে ইউরোপীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন, এবার সেটি হচ্ছে না। আগস্টে অবশ্য ট্রাম্পের সঙ্গে এক বৈঠক উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ইউরোপীয় নেতারা দ্রুত হোয়াইট হাউসে পৌঁছেছিলেন।
শুক্রবার পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করছেন বৈঠকটি ভালো হবে। তবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আমি অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত জেলেনস্কির কিছুই চূড়ান্ত নয়। ইউক্রেন অক্টোবরের পর থেকেই এই বৈঠকের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় আছে। তবু তারা স্বীকার করছেন ট্রাম্পের সঙ্গে যেকোনো বৈঠকের ফল অনিশ্চিতই থাকে। এক ন্যাটো কর্মকর্তা সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে ঝুঁকিহীন কোনো পরিস্থিতিই নেই।
রাশিয়া বল প্রয়োগে লক্ষ্য অর্জন করবে : ইউক্রেনের শান্তির জন্য কোনো তাড়া নেই জানিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, কিয়েভ যদি শান্তিপূর্ণভাবে তাদের সংঘাতের মীমাংসা করতে না চায়, মস্কো বল প্রয়োগের মাধ্যমে তার সব লক্ষ্য অর্জন করবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা তাসের বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে রয়টার্স। এর আগে ফ্লোরিডায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নির্ধারিত বৈঠকের আগে আবারও বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এ বিষয়ে ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, কিয়েভ ও আশপাশের অঞ্চলে মস্কোর ভয়াবহ বিমান হামলা প্রমাণ করে যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট একজন ‘যুদ্ধপ্রিয় মানুষ’। পুতিনের মন্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে হোয়াইট হাউসকে অনুরোধ করলেও তারা সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
টেলিগ্রাম অ্যাপে ক্রেমলিন জানিয়েছে, সরেজমিন এক পরিদর্শন চলাকালে রাশিয়ার কমান্ডাররা পুতিনকে জানান যে, তাদের বাহিনীগুলো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় মিরনোহ্রাদ, রোদিনিস্কে এবং আর্তেমিভকা শহর এবং জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের হুলিয়াইপোল ও স্টেপনোহির্স্ক শহর দখল করেছে। তবে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী মিরনোহ্রাদ ও হুলিয়াইপোলের ক্ষেত্রে রাশিয়ার দাবিকে ‘মিথ্যা বিবৃতি’ অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ বলেছে, উভয় স্থানের পরিস্থিতি এখনও ‘কঠিন’ কিন্তু ইউক্রেনীয় সেনারা ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড টেলিগ্রামে বলেছে, হুলিয়াইপোলে দুই পক্ষের মধ্যে ‘তীব্র লড়াই’ অব্যাহত আছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে আসা দাবিগুলো যাচাই করা কঠিন। কারণ উভয়পক্ষ থেকে সেখানে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে, তথ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় আর যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এসব কারণে গণমাধ্যমকে মূলত স্যাটেলাইট ও জিওলোকেটেড ভিডিও ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হয় আর এগুলো অনেক সময়ই আংশিক বা বিলম্বিত হতে পারে।
ভূখণ্ড ও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কোনো আপস নয় : ইউক্রেনের ভূখণ্ড এবং জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বিষয়গুলোকে ইউক্রেনের জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগেও এই অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে। শনিবার কিয়েভে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলেনস্কি বলেন, ‘ইউক্রেন ও ইউক্রেনীয় জনগণের জন্য কিছু রেড লাইন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আমাদের ভূখণ্ড ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আমার অবস্থান স্পষ্ট, কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা দখলকৃত কোনো কিছুকে আইনি স্বীকৃতি দেব না।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরবর্তী পদক্ষেপগুলো অনেকটাই নির্ভর করবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনকে কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত, তার ওপর।
এদিকে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কৌশলগত ‘ইউক্রেনের সমৃদ্ধির রোডম্যাপ’ নিয়ে কাজ করছে। এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে বিনিয়োগ চুক্তি ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মূল উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই পরিকল্পনায় গড় আয়ু, মাথাপিছু জিডিপি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো জাতীয় লক্ষ্যগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে।’
ইউক্রেনের পুনর্গঠনে আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে বলেও উল্লেখ করেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট। এই বিপুল অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে একাধিক আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এর মধ্যে রয়েছে সার্বভৌম বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ইউক্রেন বিল্ডিং ফান্ড, ইউক্রেন ডেভেলপমেন্ট ফান্ড এবং ফান্ড ফর ইউক্রেনস গ্রোথ অ্যান্ড অপরচুনিটিজ।
সময়ের আলো/এআর