প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে নতুন করে আশার ইঙ্গিত মিলছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তিতে ভূমি বিনিময়ের বিষয়ে নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনায় ‘শান্তির নতুন সম্ভাবনা’ দেখছেন বলে জানিয়েছেন।
মস্কো ও কিয়েভ; দুই পক্ষের এই অবস্থান যুদ্ধ বন্ধের পথে একটি কূটনৈতিক অগ্রগতির ইশারা দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
রাশিয়ার প্রভাবশালী সংবাদপত্র কোমারস্যান্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে একটি সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে রাশিয়ার দখলে থাকা কিছু ভূখণ্ড ‘বিনিময়’ করতে রাজি হতে পারেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। তবে এ ক্ষেত্রে তার একটি স্পষ্ট শর্ত রয়েছে। তা হলো দনবাস অঞ্চল পুরোপুরি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। পত্রিকাটির ক্রেমলিন সংবাদদাতা আন্দ্রেই কোলেসনিকভের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে ক্রেমলিনে শীর্ষ রুশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে পুতিন এই অবস্থান তুলে ধরেন।
বৈঠকে পুতিন জানান, গত আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার যে সমঝোতা হয়েছিল, রাশিয়া এখনও সেই অবস্থানেই রয়েছে। তার বক্তব্য ছিল, ‘দনবাস আমাদের।’ তবে দনবাসের বাইরে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু এলাকায় আংশিক ভূমি বিনিময়ের সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি নাকচ করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমানে রাশিয়া দনবাস অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ছাড়া দক্ষিণের খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের বড় অংশও রুশ বাহিনীর দখলে রয়েছে। এসব ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়েই শান্তি আলোচনার মূল দর-কষাকষি চলছে।
কোমারস্যান্ট জানায়, বৈঠকে জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও আলোচনা করেছেন পুতিন। ইউরোপের বৃহত্তম এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে রুশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রটির পরিচালনায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘যৌথ ব্যবস্থাপনা’ নিয়ে আলোচনা চলছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় ‘ক্রিপ্টো মাইনিং’ স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আংশিকভাবে ইউক্রেনকে সরবরাহের প্রস্তাব নিয়েও কথা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে আলোচনার পর জেলেনস্কি জানিয়েছেন, এই সংলাপে ‘নতুন কিছু ধারণা’ উঠে এসেছে, যা সত্যিকারের শান্তির পথে এগোতে সহায়ক হতে পারে।
বৃহস্পতিবার প্রায় এক ঘণ্টার ফোনালাপের পর জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, শান্তিকে বাস্তবের কাছাকাছি আনতে আলোচনা, বৈঠক ও সময়সূচি নিয়ে কিছু নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে। তিনি শিগগিরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করবেন বলেও জানান।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে হালনাগাদ করা ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন জেলেনস্কি। এই পরিকল্পনায় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং সেখানে একটি অসামরিক অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেছেন, যেসব এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় সেনা সরে আসবে, সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্ব ইউক্রেনীয় পুলিশই পালন করবে। এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। জেলেনস্কির মতে, ভবিষ্যতে যদি রাশিয়া আবার আক্রমণ চালায়, তা হলে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং ইউরোপীয় দেশগুলো সমন্বিতভাবে সামরিক জবাব দেবে— এমন প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। দনবাস ইস্যুতে অবশ্য দুই পক্ষের অবস্থান এখনও বিপরীতমুখী।
দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক; অঞ্চল নিয়ে গঠিত দনবাসের বড় অংশ বর্তমানে রাশিয়ার দখলে। দোনেৎস্কের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং লুহানস্কের প্রায় ৯৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে রুশ বাহিনী। শান্তি আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেলেনস্কির ওপর পুরো দনবাস রাশিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছেন বলে জানা গেছে। তবে জেলেনস্কি ভূখণ্ড ছাড়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো সমঝোতা হবে না।
এদিকে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও যুদ্ধ থামেনি। ইউক্রেন জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার রস্তভ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে ক্রুজ মিসাইল হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা দোনেৎস্ক অঞ্চলের ‘স্বিয়াতো-পোক্রোভস্কে’ এলাকা দখল করে নিয়েছে। সব মিলিয়ে পুতিনের ভূমি বিনিময়ের ইঙ্গিত এবং জেলেনস্কির শান্তি আলোচনায় আশাবাদ; এই দুই বার্তা ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ অন্ধকারে এক ধরনের কূটনৈতিক আলো দেখাচ্ছে। তবে দনবাস প্রশ্নে কঠোর অবস্থান, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা শান্তির পথকে এখনও জটিল করে রেখেছে।
এফআর