শীতকালে বাংলার অবহেলিত কৃষকের আর্তনাদ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

সম্পাদকীয়

ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন চাদর যখন প্রকৃতিকে মুড়িয়ে দেয়, যখন হাড় কাঁপানো শীতে অধিকাংশ মানুষ লেপ-কম্বলের ওমে উষ্ণতা খোঁজে, ঠিক তখনই থরথর

2025-12-30T03:51:07+00:00
2025-12-30T03:51:07+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সম্পাদকীয়
শীতকালে বাংলার অবহেলিত কৃষকের আর্তনাদ
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:৫১ এএম 
ফাইল ছবি
ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন চাদর যখন প্রকৃতিকে মুড়িয়ে দেয়, যখন হাড় কাঁপানো শীতে অধিকাংশ মানুষ লেপ-কম্বলের ওমে উষ্ণতা খোঁজে, ঠিক তখনই থরথর কাঁপুনি নিয়ে কর্দমাক্ত মাঠে নামেন বাংলার একজন কৃষক। পৌষের হাড় কাঁপানো হিমেল হাওয়া যার হাড়ের ভেতর গিয়ে বিঁধে, সেই মানুষটিই আমাদের অন্ন জোগানদাতা। বাংলার চিরায়ত লোকজ ঐতিহ্যে শীত উৎসবের ঋতু হলেও কৃষকের জীবনে এটি এক অমানবিক সংগ্রামের অধ্যায়। যার ঘামে ভেজা মাটিতে আমাদের থালায় অন্ন জোটে, সেই কৃষকের জীবন কেন জীর্ণ, কেন তার দুই চোখে কেবলই হাহাকার?

কৃষক আমাদের সমাজের মেরুদণ্ড হলেও তাদের জীবন চরম অবহেলা আর বঞ্চনায় কাটে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে তাদের কষ্ট বর্ণনাতীত। কৃষক প্রকৃতির সেবক। তীব্র গরম, অবিরাম বর্ষা কিংবা হাড় কাঁপানো শীত- কোনোটিই তাকে মাঠ থেকে দূরে রাখতে পারে না। তারা শীতের কুয়াশার চাদর ভেদ করে বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ করেন। বর্ষায় হাঁটুসমান কাদাপানিতে ভিজে ধান রোপণ করেন। গ্রীষ্মকালে প্রখর রোদে পুড়ে ফসল কাটা ও মাড়াই করেন। এই আত্মত্যাগকে কেবল পেশা বলা যায় না, বরং এটি মানবজাতির প্রতি এক মহান সেবা।

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকই প্রান্তিক। তাদের নিজস্ব জমি নেই বললেই চলে; অধিকাংশ বর্গাচাষি। সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের উচ্চমূল্য মেটাতে গিয়ে তারা মহাজন বা এনজিওর কাছে ঋণী হয়ে পড়েন। ফসল কাটার পর ঋণের টাকা পরিশোধ করতেই তাদের আয়ের সিংহভাগ চলে যায়। সঞ্চয় করার মতো উদ্বৃত্ত অর্থ তাদের হাতে থাকে না বলেই তারা ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থায় দিনাতিপাত করেন।

বাংলাদেশের কৃষকরা অন্যতম শীতপ্রবণ এলাকা উত্তরবঙ্গে (রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়) শীত মৌসুমেও সবচেয়ে বেশি কর্মব্যস্ত থাকেন। এ ছাড়া বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও যশোর অঞ্চলে শীতকালীন শাকসবজি ও আলু চাষের ব্যাপকতা দেখা যায়। উত্তরবঙ্গের কৃষক তীব্র শীতের প্রকোপ সহ্য করেই দেশের প্রধান খাদ্যভান্ডার সচল রাখেন।

দুঃখজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের কৃষক যেন দারিদ্র্যের উত্তরাধিকারী, কৃষকের সন্তানও গরিব কৃষক বনে যান। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণে একটি দুষ্টচক্র। অর্থাভাবে কৃষকের সন্তানরা উচ্চ শিক্ষা পায় না। ছোটবেলা থেকেই তারা বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হয়। কারিগরি শিক্ষা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব এবং পুঁজির অভাবে তারা পৈতৃক পেশা অর্থাৎ কৃষিতেই আটকে থাকে। এভাবে দারিদ্র্য এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চালিত হয়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকের বসতি ও স্বাস্থ্যের জীর্ণদশা, কারণ সামান্য আয়ে পেটের ভাত জোগানোই যেখানে দায়, সেখানে ঘর মেরামত বিলাসিতা। বাঁশের বেড়া আর পুরোনো টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি তাদের ঘরগুলো শীতের হিম হাওয়া আটকাতে ব্যর্থ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ভগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী। পুষ্টিহীনতা, হাড়ভাঙা খাটুনি এবং কনকনে ঠাণ্ডায় কাদাপানিতে কাজ করায় কৃষকরা বাত-ব্যথা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভোগেন। অনেকে তীব্র শীতে প্যারালাইজড হয়ে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েন। চিকিৎসার টাকা না থাকায় তারা ঝাড়-ফুঁক বা হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর নির্ভর করেন, যা তাদের স্বাস্থ্যকে আরও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

বাংলাদেশে শীতকালে ভোরে সেচ দেওয়া বা চারা রোপণের সময় কৃষকের গায়ে পর্যাপ্ত গরম কাপড় থাকে না। একটি পাতলা চাদর বা ছেঁড়া সোয়েটারই তাদের একমাত্র সম্বল। অধিকাংশ কৃষকই পুরোনো ও সস্তা কাপড়ের ওপর নির্ভরশীল। হাড় কাঁপানো শীতে উন্নতমানের শীতবস্ত্র তাদের কাছে স্বপ্নের মতো।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে কৃষকদের অবদানের স্বীকৃতি কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তারা চরম অবহেলিত। সরকারি কৃষি কর্মকর্তা বা স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। তারা কোনো ‘ভোট ব্যাংক’ বা শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী নয় বলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কণ্ঠস্বর সবসময় ক্ষীণ থেকে যায়।

বাংলাদেশে শীতকালে ফলন বেশি হওয়ায় বাজারে সবজির সরবরাহ বেড়ে যায়। কিন্তু পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার নেই। মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষক মাঠ পর্যায়ে দাম পায় না। ফলে খুচরা বাজারে দাম বেশি থাকলেও কৃষক অনেক সময় ১-২ টাকা কেজি দরেও সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হন, যা তাদের উৎপাদন খরচের অর্ধেকও নয়।

বাংলাদেশে এই শীতে আলুচাষিদের মাথায় যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। এ সময় আলুর মূল্য পানির মূল্য থেকে কম বলা যেতে পারে। অন্যদিকে এ বছর আলু বীজের উচ্চমূল্য, সারের সংকট এবং শেষ সময়ে অতিবৃষ্টি বা নাবি দশা রোগের কারণে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাজারদর উৎপাদন খরচের চেয়ে নিচে নেমে যাওয়ায় চাষিরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। হিমাগারে আলু রাখার চড়া ভাড়াও তাদের কষ্টের অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের গরিব কৃষকদের জন্য জনসাধারণ ও ধনীদের করণীয় নির্ধারণ করা উচিত। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি করণীয় নিচে সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ করা হলোÑ প্রথমত আমরা যে খাবার খাচ্ছি তার জন্য কৃষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

দ্বিতীয়ত সম্ভব হলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনা যাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভ নিতে না পারে। তৃতীয়ত ধনীদের উচিত দানের অর্থ দিয়ে কৃষকদের মাঝে উন্নত শীতবস্ত্র ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা। গ্রামভিত্তিক ‘কৃষক সহায়তা তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে। চতুর্থত বাংলাদেশের সামর্থ্যবানদের উচিত শীত মৌসুমে কৃষকদের জন্য বিশেষায়িত ওয়াটারপ্রুফ এবং থার্মাল পোশাক বিতরণ করা। যেহেতু তাদের কাদা-পানিতে কাজ করতে হয়, তাই সাধারণ কম্বল বা সোয়েটার ভিজে গেলে আরও ঠাণ্ডা লাগে। তাদের জন্য রেইনকোট সদৃশ উষ্ণ পোশাক কাজের গতি বাড়াতে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক হবে।

দরিদ্র কৃষকদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত সুদবিহীন কৃষিঋণের সুদ বিতরণ করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা, ইউনিয়ন পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনা নিশ্চিত করা।

অতীব দুঃখের বিষয় হলো, সেবা করার নামে বাংলাদেশের অধিকাংশ এনজিও চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ নেয়। কিস্তি দেওয়ার চাপে কৃষক অনেক সময় আগাম ফসল কম দামে বিক্রি করে দেন। এই ঋণ শোধ করতে গিয়ে তারা আরও নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সরকারের উচিত এই ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার কঠোর তদারকি করা।

পৌষের হাড় কাঁপানো শীতে যখন সচ্ছল মানুষ উষ্ণতার খোঁজে লেপ-কম্বলের নিচে আশ্রয় নেয়, ঠিক তখনই বাংলার ফসলের মাঠের গরিব কৃষকের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কনকনে ঠাণ্ডায় ছেঁড়া এক টুকরো চট গায়ে জড়িয়ে কৃষক যখন তার শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে ভোরে মাঠে যায়, হিমশীতল হাওয়া যেন তার হাড়ের ভেতর গিয়ে বিঁধে। প্রচণ্ড কুয়াশায় ঢাকা সকালে তাদের কাঁপাকাঁপা হাত যখন লাঙল ধরে, তখন সেই হাতের রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে যায়।

বাংলার কৃষক যে ধানে সোনালি স্বপ্নের জাল বুনেছিল, অতি শীতে সেই ধানের চারাগুলো যখন বিবর্ণ হয়ে নুয়ে পড়ে, তখন কৃষকের দীর্ঘশ্বাসে প্রকৃতিও যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখ আর মহাজনের ঋণের বোঝা তাদের চোখের ঘুম কেড়ে নেয়, ফলে হাড় কাঁপানো এই শীত তাদের কাছে কোনো উৎসব নয়, বরং এক ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। কুয়াশার চাদরে ঢাকা অন্ধকার ভোরে এক মুঠো গরম ভাতের আশায় তারা যে কঠোর পরিশ্রম করে, তার বিনিময়ে জোটে শুধু অবহেলা আর হাড়ভাঙা কষ্ট।

বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষকের পা ফাটা আর রুক্ষ চামড়াগুলো যেন দারিদ্র্যের একেকটি জীবন্ত মানচিত্র। রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে একটু উষ্ণতার চেষ্টা করলেও হাড় কাঁপানো বাতাস সেই আগুনকেও নিভিয়ে দিতে চায়। চারদিকে যখন আনন্দ-উৎসবের আমেজ, তখন এই মানুষগুলোর বোবা কান্না কেবল আকাশের নীল ধোঁয়ায় বিলীন হয়ে যায়। পৌষের এই হিমেল রাত তাদের কেবল কষ্টই দেয় না, বরং তাদের জীবনের অনিশ্চয়তাকে আরও প্রকট করে তোলে। শেষ পর্যন্ত শীতের তীব্রতায় যখন কোনো বৃদ্ধ কৃষক নিথর হয়ে পড়ে থাকে, তখন যেন বাংলার আকাশ সেই বেদনায় গুমরে কেঁদে ওঠে। এই বাস্তবতা কোনো রূপকথা নয়, বরং বাংলার মাঠ-ঘাটে মিশে থাকা এক অবর্ণনীয় দীর্ঘশ্বাস।

কৃষকের চোখে যে জল, তা আসলে আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন। যে হাতের পরশে ধরণি শস্যশ্যামলা হয়, সেই হাতগুলো শীতের প্রকোপে নীল হয়ে থাকবে এটি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

তাই শীতের এই কঠিন সময়ে শুধু সহমর্মিতা নয়, প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও সামাজিক সচেতনতা। আমাদের প্রতিটি দানাদার অন্নের পেছনে লুকিয়ে থাকা কৃষকের দীর্ঘশ্বাস যদি আমরা অনুভব করতে পারি, তবেই সার্থক হবে আমাদের মানবতা। আসুন, এই শীতে আমরা আমাদের অন্ন জোগানদাতার পাশে দাঁড়াই, তাদের জীর্ণ ঘরে কিছুটা উষ্ণতা পৌঁছে দিই।

এএডি/
Advertisement
Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: