অনলাইন জুয়া, সময়ের নীরব ঘাতক

মুহিবুল হাসান রাফি

সম্পাদকীয়

তরুণ ও যুব সমাজে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের আসক্তির পাশাপাশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সময়ের নীরব ঘাতক অনলাইন জুয়া। শহর থেকে

2025-12-30T03:57:49+00:00
2025-12-30T03:57:49+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্পাদকীয়
অনলাইন জুয়া, সময়ের নীরব ঘাতক
মুহিবুল হাসান রাফি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:৫৭ এএম 
ফাইল ছবি
তরুণ ও যুব সমাজে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের আসক্তির পাশাপাশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সময়ের নীরব ঘাতক অনলাইন জুয়া। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এর দাপট অনেকটা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রতিরোধ, প্রতিকার কিংবা তরুণ ও যুব সমাজে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আদৌ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এটি এমন এক নেশায় পরিণত করে, যা বাসাবাড়ি, বাস-ট্রেন, ফুটপাথ থেকে রিকশা গ্যারেজ, কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে। প্রায় কম-বেশি সব শ্রেণির মানুষ এতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। মোবাইলে অ্যাপ নামিয়ে কিংবা চোখের সামনে ভেসে আসা জুয়ার লোভনীয় অফারে প্রলুব্ধ হয়ে অনেকে তৎক্ষণাৎ জড়িয়ে পড়ছে নিমিষেই। শিক্ষিত কিংবা এর চেয়ে কম লেখাপড়া জানা লোকের এতে আসক্ত হচ্ছে বেশি। অনলাইনে বিভিন্ন জুয়ার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ, ফুটবল লিগ নিয়েও জুয়া চলছে। অনেকে ক্রিকেটের বলে বলে চার-ছক্কা হওয়া নিয়ে ছোট থেকে বড় অঙ্কের জুয়া খেলছে। ফুটবলে গোল হওয়া বা কোন দল জিতবে তা নিয়েও জুয়া খেলা হচ্ছে। অনলাইনে আরও নানা ধরনের নিত্যনতুন জুয়ার অ্যাপ প্রতিনিয়তই খোলা হচ্ছে এবং এতে তরুণ সমাজ লোভনীয় অফারে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে।

শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তরুণ সমাজ অনলাইন জুয়ায় মগ্ন হচ্ছে, তার অহরহ প্রতিবেদন উঠে আসে পত্রিকায়। অনলাইন জুয়ার অ্যাপ ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা জুয়ায় নষ্ট করছে। অনেকে আবার বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করছে। জুয়ার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তারা যেমন নিঃস্ব হচ্ছে ঠিক তেমনি তাদের পরিবারকে পথে নামাচ্ছে। জুয়ায় হেরে হতাশ হয়ে মাদকাসক্ত ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। দুটোই মানুষের মৃত্যুর পথ তৈরি করে। 

Advertisement
পত্রপত্রিকার খবরে প্রায়ই এ দুই নেশার কারণে খুন, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংসারে অশান্তি সৃষ্টিসহ সংসার ভেঙে যাওয়ার খবরও দেখা যায়। অনলাইন জুয়া নতুন কিছু নয়। তবে তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ না থাকায় এর বিস্তৃতি মহামারি আকার ধারণ করেছে। এক সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন অ্যাপ তৈরি করে লোভনীয় অফার দিয়ে তরুণদের জুয়ায় আকৃষ্ট করছে। হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থ।

এসব জুয়ায় তাদের সমীকরণে সবাই হেরে যায়। প্রতারক চক্র চালাকি করে দুয়েকজন, যারা তাদেরই লোক, তাদের জিতিয়ে দেখিয়ে অন্যদের প্রলুব্ধ করে, কাছে টেনে নেয় তরুণদের। হেরে যাওয়ার পর জেতার জেদ হয়, এই জেদ থেকে তৈরি হয় নেশা। ফলে নিঃস্ব হয়ে যায়, হতাশায় নিমজ্জিত হয়। অনলাইন জুয়াকে প্রমোট করার জন্য শোবিজ এবং ক্রিকেটের বেশ কয়েকজন তারকাকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হতে দেখা যায়। তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে বিজ্ঞাপন তৈরি করে অনলাইনে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এসব তারকাদের কথায় তাদের ভক্ত ও সাধারণ মানুষ প্রলুব্ধ হয়ে জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। তাদের করা বিজ্ঞাপন বিভিন্ন অশ্লীল সাইটেও ব্যাপক হারে প্রচার করা হচ্ছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শোচনীয়। 

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয় কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে। তাদের হাতে টাকা নেই। অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে গেছে। অতি দারিদ্রসীমা ক্রমেই বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানার উৎপাদনে স্থবিরতা বিরাজ করছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বলতে গেলে নেই। শেয়ারবাজার যতটুকু ছিল, তা-ও এখন নেই। শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। এখানে শত শত তরুণ যুক্ত ছিল। পুঁজি হারিয়ে তারা নিঃস্ব ও হতাশ হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে তাদের অনেকে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে। ব্যাংক খাতও ধুঁকছে। অনেক ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়ায় মানুষের আস্থা কমে গেছে। নিরাপদ মনে করছে না। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের কাছে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা সে পূরণ করতে পারছে না।

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অর্থ উপার্জনের জন্য অবহেলিত বেকার তরুণ সমাজ অনলাইন জুয়ায় নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে। মানুষের থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে হলেও এসব জুয়ায় মেতে উঠছে। এমনকি অনেকে সংসার চালানোর জন্য স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। আর অনেকে খেলছে স্বর্ণালংকার ও জায়গা-জমি বন্ধক রেখে। এমনকি অনেক সময় নিজের প্রেমিকা কিংবা স্ত্রীকে পর্যন্ত বন্ধক রাখে সামান্য কিছু টাকার জন্য। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরিভিত্তিক এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পদক্ষেপ নেওয়ার কথা থাকলেও তা সীমাবদ্ধ ছিল কাগজে-কলমে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়, তা হলে জুয়ার এই ভয়াবহ ছোবল থেকে এই সমাজকে রক্ষা করা যাবে না। জুয়ার সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব কিছু না।

এরপরেও কয়েকজনকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলে ওপর মহল থেকে তাদের জামিনে ছাড়িয়ে নিয়ে একই কাজ করতে বাধ্য করা হয় কিংবা একই কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। জুয়া প্রতিরোধ করতে এমন অত্যন্ত কঠোর আইন করা দরকার, যা জামিন করা যাবে না। যাতে কিছুটা হলেও বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। আইনের পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টি করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেমিনার, কম্পোজিয়াম করা এবং গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক করা। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলসহ অনলাইন মাধ্যমে জুয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা এবং তা থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো এবং অবসর সময়ে মনকে বিকশিত করার জন্য ক্রীড়াঙ্গন, সাহিত্যঙ্গন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের দিকে আহ্বান জানাতে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারকে কর্মসংস্থান খাত তৈরি করে তরুণদের জন্য কর্মমুখী পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। এর ফলে নীরব ঘাতক থেকে সর্বস্তরের জনগণকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এএডি/
Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: