প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৪:৪৪ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে যে উত্থান খালেদা জিয়ার ঘটেছে, রাজনীতির ইতিহাসে তা এক বিরল ঘটনা। খালেদা খানম পুতুল থেকে আরেকটি যেন আচমকাই খালেদা জিয়ায় পরিণত হয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান। এ ছাড়া তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন। খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ নিয়ে মা তৈয়বা মজুমদারের ভয় ছিল। কারণ জনগণের জন্য তিনি তার জামাই শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারিয়েছেন। মেয়ে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে নেমেছে। জানি না কী হয় বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
১৯৮২ সালে রাজনীতিতে আসার পর অন্তত পাঁচবার আটক হয়ে কারাভোগ জীবন ভোগ করতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। এর মধ্যে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনবার, ২০০৭ সালে মইনুদ্দিন ফখরুদ্দিনের শাসনামলে একবার। আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ শাসনামলে একবার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৪১ বছর পার করেছেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর খালেদা জিয়াকে আপসহীন নেত্রীর উপাধি দেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছিল স্বামী শহিদ জিয়াউর রহমানকে হারানোর বেদনা নিয়ে। ১৯৮১ সালে ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর সংকটে পড়ে বিএনপি। ঠিক সে সময় গৃহবধূ থেকে খালেদা জিয়া দলটিতে যোগ দেন। অর্থাৎ ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৯৮৩ সালে সাত দলীয় জোট গঠন করে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম শুরু করে। এরশাদের স্বৈরশাসন অবসানের লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামে খালেদা জিয়া অবৈধ এরশাদ সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করেননি। বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞামূলক আইন দিয়ে স্বাধীন গতিবিধিকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আট বছরে সাতবার অন্তরীণ করা হয়। কিন্তু এরপরও জেনারেল এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে সক্রিয় থেকে সরে যাননি। বরং পুরো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া।
৪১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বহুবার সংকটের মুখে পড়েছেন খালেদা জিয়া। নব্বইর গণআন্দোলনের পর বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর থেকে আদালতের আদেশে যেমন তার স্বামীর সময়ে পাওয়া বাড়ি হারাতে হয়েছে। তেমনি ছোট সন্তান আরাফাত রহমান কোকোর মরদেহ দেখতে হয়েছে। ২০১৫ সালে ৩ মাসের অবরোধ চলাকালে তার বিরুদ্ধে আগুন সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে। খালেদা জিয়ার অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন দেখে অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। দেশের জনপ্রিয়তম নেত্রী তিনিই। তবে এ কথা ঠিক, নির্বাচন করে কখনোই নিজের আসনে হারতে হয়নি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে।
খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। বিরোধিতার কেন্দ্রে থাকা নেত্রী। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জন্য তিনি সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষিণ সার্কের চেয়ারপারসন ছিলেন দুবার। তিনি মূলত দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অপরিহার্য চরিত্র। খালেদা জিয়ার জীবন যেন বাংলার রাজনীতির চলমান উপাখ্যান। ব্যবসায়ী পিতার ঘরে জন্ম, সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে, স্বাধীনতা যুদ্ধে বন্দিদশা, অল্পবয়সে বিধবা, সন্তানদের লালন। তারপর রাজনীতিতে অভিষেক। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রথমে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারে বন্দি ছিলেন। পরে স্বাস্থ্যগত কারণে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়। দীর্ঘ ২ বছরের বেশি সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার শর্তসাপেক্ষে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়। এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ মুক্তি ছিল না। বিগত ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার দণ্ড মওকুফ করে তাকে মুক্তি দেন। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস পান।
এ কথা দেশবাসীর অজানা নয়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পর চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে নিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে তার শারীরিক অবস্থার ফের অবনতি হলে গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘ ৩৭ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে তিনি গতকাল মঙ্গলবার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
কিন্তু খালেদা জিয়ার মৃত্যু নেই। তিনি চিরঞ্জীব। যে কারণে মৃত্যুর খবরে বিশ্ব মিডিয়া যেমন হতবাক হয়েছে। তেমনি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বেশিরভাগ মিডিয়া উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক বৈরিতা আর সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন ভূমিকা মনে রাখার মতো। আবার কোনো কোনো মিডিয়া উল্লেখ করেছে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশে একটি শূন্যতা তৈরি হলো।
আসলে খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন হাল না ছাড়ার প্রতীক। তার জীবনের ইতিহাস হচ্ছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার প্রতীক। রাজনীতি জীবনের বিচিত্র অধ্যায়ে খালেদা জিয়া নামটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে লেখা রবে এক স্থায়ী চিরঞ্জীব রেখা হিসেবে। যেন তিনি বাংলার রাজনীতিতে এক চলমান উপাখ্যান।
সময়ের আলো/এনএ