রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই রুশ-নিয়ন্ত্রিত খেরসন অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে স্থানীয় রুশ কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান জানান দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এর পাশাপাশি রাশিয়ার নভগোরোদ অঞ্চলে পুতিনের বাসভবনে কথিত ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার দাবি নতুন করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। খবর ব্লুমবার্গ, আলজাজিরা ও দ্য ইউএস সানের।
খেরসনে ড্রোন হামলা : রুশ-নিয়ন্ত্রিত খেরসন অঞ্চলের খোরলি গ্রামে মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছেন ওই অঞ্চলের রাশিয়া-নিযুক্ত প্রধান ভ্লাদিমির সালদো। ব্লুমবার্গের খবরে বলা হয়, কৃষ্ণ সাগরের উপকূলবর্তী ওই গ্রামে একটি ক্যাফে ও একটি হোটেল লক্ষ্য করে তিনটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালানো হয়।
সালদো টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে জানান, হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৫০ জনের বেশি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি ড্রোনের একটি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক বহন করছিল। ড্রোনগুলো একটি লনে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর আছড়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে ক্যাফে ও হোটেলে আগুন ধরে যায়। তিনি বলেন, আগুনের তীব্রতার কারণে জরুরি উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত অনেককে উদ্ধার করতে পারেননি। ভোরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে রাশিয়ার এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাশিয়া ও ইউক্রেন প্রায় প্রতিদিনই একে অপরের ওপর ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। রাশিয়া নিয়মিত ইউক্রেনের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে দেশটিতে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুদ্ধ বন্ধে উভয়পক্ষের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ বাড়ছে এবং নতুন বছরের আগে একাধিক আলোচনাও হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুতিন-জেলেনস্কির পরস্পরবিরোধী অবস্থান : ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নতুন বছরের ভাষণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে রাশিয়াই জয়ী হবে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে পুতিন ইউক্রেনে যুদ্ধরত সেনাদের প্রতি সমর্থন জানান এবং রুশ জনগণকে তাদের পাশে থাকার আহ্বান জানান। পুতিন বলেন, ‘আমরা তোমাদের ওপর বিশ্বাস করি, আমাদের বিজয়ের ওপরও বিশ্বাস করি।’ তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো- যুদ্ধের ফল এখনও অনিশ্চিত। একদিকে শান্তি আলোচনা চলছে, অন্যদিকে তীব্র লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
এই ভাষণকে অনেকেই ২৬ বছর আগের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। ১৯৯৯ সালের নববর্ষের প্রাক্কালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন পুতিনের হাতে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়াকে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন তিনি।
পুতিনের শাসনামলে চেচনিয়া, জর্জিয়া ও সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। ইউরোপে আশঙ্কা রয়েছে- ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তা দেশটির সীমা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নববর্ষের ভাষণে বলেন, তারা শান্তি চান, তবে কোনো দুর্বল চুক্তি নয়। তার ভাষায়, ‘আমরা যুদ্ধের শেষ চাই, কিন্তু ইউক্রেনের শেষ নয়।’ তিনি জানান, শান্তিচুক্তি প্রায় ৯০ শতাংশ প্রস্তুত হলেও বাকি ১০ শতাংশই পুরো প্রক্রিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
পুতিনের বাসভবনে হামলার দাবি : এর মধ্যেই রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করে, ইউক্রেন নভগোরোদ অঞ্চলে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট পুতিনের একটি বাসভবনে ড্রোন হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। দ্য ইউএস সানের খবরে বলা হয়, রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ওই ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে এবং একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
রুশ সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইউক্রেনের সুমি ও চেরনিহিভ অঞ্চল থেকে মোট ৯১টি ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। পুতিনের বাসভবনের কাছাকাছি লেক ভালদাই এলাকায় একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়, যাতে প্রায় ছয় কেজি বিস্ফোরক ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে ইউক্রেন এই অভিযোগকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। কিয়েভ বলছে, এটি একটি সাজানো নাটক, যার উদ্দেশ্য শান্তি আলোচনা ভণ্ডুল করা এবং যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানো। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই সিবিকা বলেন, রাশিয়া এই দাবির পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
এমনকি নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে জানা যায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে- এই সপ্তাহে ইউক্রেন পুতিন বা তার বাসভবনকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালায়নি।
এই ঘটনায় ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে ইউক্রেনের বক্তব্যÍযে ঘটনা ঘটেনি, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা অনুচিত। পশ্চিমা মিত্ররাও রাশিয়ার দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
খেরসনের প্রাণঘাতী হামলা, পুতিনের বিজয়ী হওয়ার ঘোষণা এবং তার বাসভবনে কথিত হামলার দাবি- সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন বছরে আরও জটিল ও অনিশ্চিত রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধ ও কূটনীতির এই দ্বিমুখী বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগও ক্রমেই বাড়ছে।
সময়ের আলো/এসকে/