প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক যেমন হওয়া দরকার, বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রে যেন তার উলটো। মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করলেও ক্রমশ আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার কারণে পার্শ্ববর্তী দেশটি এদেশের জনগণের হৃদয় জয় করতে পারেনি। কয়েক যুগ ধরে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক আগ্রাসনের পাশাপশি সীমান্ত হত্যা ভারতকে শত্রু বানিয়েছে এদেশের মানুষের কাছে। তার ওপর স্বৈরাচার আওয়ামী লীগকে ভোট চুরির নির্বাচনে সমর্থন বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জনগণের সঙ্গে বৈরিতা থাকলেও আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক বেশ উষ্ণ ছিল দুদেশের। কিন্তু গত বছরের পাঁচ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন হলে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নামে তলানিতে। চলতি বছরে দুদেশের মধ্যে ঘটা আলোচিত পাঁচ বিষয় তুলে ধরা হলো :
ধারাবাহিক সীমান্ত হত্যা
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। তাদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনের পর মারা যান।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন এ তথ্য জানানো হয়।
একই সময়ে ৩৮ জন গুলিবিদ্ধ বা শারীরিকভাবে আহত এবং ১৪ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন; যাদের মধ্যে চারজনকে পরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
চলতি বছরে ৩৪ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। ফাইল ছবি
আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরজুড়ে মব সন্ত্রাস আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কোনো প্রমাণ, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শুধু সন্দেহ, গুজব সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়েছে।
আসক বলছে, এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উদাসীনতার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই মব তৈরি করে হত্যা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে; যা দেশে আইনের শাসনের জন্য চূড়ান্ত হুমকিস্বরূপ এবং সমাজে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
ভিসা বন্ধ
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সব খুনিদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া ও ভারতীয় প্রক্সি রাজনৈতিক দল, মিডিয়ালীগ ও সরকারি কর্মকর্তাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে জুলাই ঐক্য ‘মার্চ টু হাইকমিশন’ কর্মসূচি ঘোষণা করলে ১৭ ডিসেম্বর রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় দিল্লি।
১৭ ডিসেম্বর নিরাপত্তা সংকটে ঢাকার ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় দিল্লি। ফাইল ছবি
অন্যদিকে ২২ ডিসেম্বর দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন কনস্যুলার সেবা ও ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। হাইকমিশনের সামনে ও বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ এবং শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা সেন্টারে হামলার ঘটনার পর এ সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা।
পাল্টাপাল্টি তলব
নয়াদিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশি মিশনের সামনে হিন্দুত্ববাদীদের একাধিক বিক্ষোভের জেরে গত ২৩ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রণয় ভার্মাকে তলবের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশের দূতকে পাল্টা তলব করে দিল্লি। দুই পক্ষ থেকেই ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং নিরাপত্তা জোরদারে সহযোগিতা চাওয়া হয়।
হিন্দুত্ববাদীদের একাধিক বিক্ষোভের জেরে ২৩ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফাইল ছবি
শুধু চলতি মাসেই দুইবার পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনা ঘটে। এছাড়া সারা বছরজুড়ে নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে দুদেশের কূটনৈতিকদের মধ্যে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি দেওয়ার অনেকগুলো ঘটনা ঘটে।
মোদি-ইউনূস সাক্ষাৎ
চলতি বছরের ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন শেষে ড. ইউনূস ও মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো নরেন্দ্র মোদি এ বৈঠকে মিলিত হন।
৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডে ড. ইউনূস ও মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ফাইল ছবি
ওই বৈঠকে দুদেশের শীর্ষ নেতারা ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের শীলতা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
জয়শঙ্করের আগমন
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ফাইল ছবি
ঢাকায় এসে তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন। ওইদিন রাতেই তিনি দিল্লি ফিরে যান।
/এমএইচআর