সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের আবহে বছর শেষ করল বাংলাদেশ। নানা কারণে দেশের রাজনীতিতে বিদায়ী বছর ছিল ঘটনাবহুল। আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা, শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও জোট-ভোটের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণসহ নানা ইস্যুতে বছরজুড়ে উত্তপ্ত ছিল রাজনৈতিক অঙ্গন।
ধানমন্ডি ৩২-এ ভাঙচুর
বছরের শুরুর দিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ছড়ায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে। ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতির বক্তব্য প্রচারকে ঘিরে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ফের ভাঙচুরের মুখে পড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি। তার বক্তব্য প্রচারকে ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থী ও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের মাঝে। দলে দলে শিক্ষার্থী ও বিক্ষুব্ধ মানুষ লাঠি ও ভারি বস্তু দিয়ে স্থাপনার বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর করেন।
এনসিপির আত্মপ্রকাশ
জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আত্মপ্রকাশের অনুষ্ঠান ঘিরে এদিন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছিল মানুষে সয়লাব।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ
গত ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
ইউনূস-তারেক বৈঠক
গত ১৩ জুন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক ছিল দেশের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ওই বৈঠকের পরই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ
দেশব্যাপী পদযাত্রার অংশ হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত গোপালগঞ্জে গত ১৬ জুলাই সমাবেশ করতে গিয়ে একপর্যায়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এ কর্মসূচি ঘিরে হামলা, সংঘর্ষে পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে হামলাকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের পর প্রথমে শহরে ১৪৪ ধারা এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় গোপালগঞ্জ ছাড়েন এনসিপির নেতারা।
জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র
জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলিল জুলাই সনদ। গত ১৭ অক্টোবর এ ঐতিহাসিক সনদ স্বাক্ষরিত হয় এবং এর মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
৫ আগস্ট রাজনীতির ময়দানে নানারকম আলোচনার জন্ম দিয়ে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাতে চব্বিশের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির অঙ্গীকার রাখা হয়েছে। অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিকাল ৫টার পর জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু হয় ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ঘোষণার অনুষ্ঠান। সেখানে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে পাশের রেখে ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
নির্বাচনের তফসিল
গত ১২ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৯ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের শেষ তারিখ ১১ জানুয়ারি। আপিলের শুনানি ১২ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ বলেও ঘোষণায় জানানো হয়। ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলবে।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা
৮০ বছর বয়সী বেগম খালেদা জিয়া ২৩ নভেম্বর ফুসফুস সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতায় দেশের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু সর্বস্তরের মানুষ দোয়া কামনা করেন। মিলাদ-মাহফিলসহ মসজিদ-মাদ্রাসায় চলে আরোগ্য কামনা।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় পর ২৫ ডিসেম্বর জন্মভূমিতে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে সারা দেশ থেকে ঢাকায় লাখ লাখ নেতা-কর্মীর সমাগম হয়। ঢাকা মহানগরী যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, সিএনএন, দ্য ডন থেকে শুরু করে প্রতিবেশী ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরটিকে প্রধান শিরোনাম করে। বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশের ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ এবং ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের শীর্ষ নেতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ওসমান হাদি হত্যা
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদী বিক্ষোভ-মিছিল হয়। রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে উঠে।
১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাত পৌনে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে মহাসড়ক- সবখানেই নেমেছে ছাত্র-জনতা। একদল হামলাকারী জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয় ও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এদিন ছায়ানট ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও হামলা-অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পরদিন ১৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ চত্বরে হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে। এদিন কবি নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।
নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে নাটকীয় পরিবর্তনের হাওয়া। সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে পরিচিত অনেক রাজনীতিবিদের হঠাৎ আদর্শ পরিবর্তন এবং জোটবদ্ধ হওয়ার নতুন সমীকরণ।
গত ২৮ ডিসেম্বর জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা আটটি দলের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। পরদিন সন্ধ্যায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় তারা যুক্ত আছেন তারাও।
এর আগে গত ৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আরেকটি জোটের ঘোষণা করা হয়। জাতীয় পার্টির একাংশ ও জাতীয় পার্টির (জেপি) নেতৃত্বে এই জোটের নাম হয়েছে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ)। জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন অংশ দুটিসহ মোট ১৮টি দল থাকছে এই জোটে।
নিজের গড়া ট্রাইব্যুনালে হাসিনার ফাঁসির রায়
গত ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো সরকারপ্রধানকে মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনতে হয়েছে। চব্বিশের জুলাই গণহত্যা মামলায় নিজের গড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই এমন দণ্ড পেয়েছেন দেড় দশকের ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ হওয়া দেশান্তরী শেখ হাসিনা।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও ঐতিহাসিক জানাজা
নানা রোগে জটিলতা ও শরীর-মনে ধকল সহ্য করে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। হাসপাতালে ভর্তি হন গত ২৩ নভেম্বর। গত ৩০ ডিসেম্বর তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ দেশের রাজনীতির প্রধান অভিভাবক, জাতীয় ও আপোসহীন দেশনেত্রী খ্যাত বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়ে গভীর শোক প্রকাশ করেন। বছরের শেষ দিনে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেষ বিদায়ে লাখো মানুষ অংশগ্রহণ করে। ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজার সাক্ষী হয় রাজধানী ঢাকা। কোনো মুসলিম নারীর এটিই সর্ববৃহৎ জানাজা। এই ব্যাপ্তি শুধু মানুষের সংখ্যা দিয়েই নয়, আবেগ, ভালোবাসা ও অশ্রু দিয়েও যা ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ড। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নাম লিখে চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি।
তবে সদ্য শুরু হওয়া ২০২৬ সালে ভালো কিছুর প্রত্যাশাই করছেন দেশের মানুষ। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি যেন অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর হয় সে প্রত্যাশা করছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। একই সঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেন আবারও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ভালোভাবে শামিল হতে পারে সে প্রত্যাশাও রয়েছে দেশের মানুষের।
সময়ের আলো/জেডআই