নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতিতে শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়। বছরের প্রথম দিন দায়িত্ব নেওয়ার পরই সাবেক মেয়রের জারি করা ইসরায়েল-সমর্থনমূলক নির্বাহী আদেশ বাতিল করে আলোচনায় এসেছেন সদ্য নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। সাহসী সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তনের বার্তা দিয়েই নগর পরিচালনার যাত্রা শুরু করেছেন ৩৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।
শপথ গ্রহণের পর দেওয়া ভাষণে মামদানি বলেন, নিউইয়র্ক সিটি হল এখন থেকে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে নির্ভীক ভূমিকা রাখবে। তার প্রশাসন হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে। তিনি বলেন, নিউইয়র্কের প্রায় ৮৫ লাখ মানুষকে সঙ্গে নিয়েই নতুন ধরনের রাজনীতি গড়ে তোলা হবে।
নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটানে সিটি হলের সামনে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজিত অভিষেক অনুষ্ঠানে তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের নিচে। কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ নতুন মেয়রকে স্বাগত জানাতে সেখানে জড়ো হন। অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন স্পর্শ করে শপথ নেন মামদানি। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান।
শপথের পর জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, পরিবর্তনের সুযোগ খুব কম সময়ই আসে, আর সেই পরিবর্তনের নিয়ন্ত্রণ যখন সরাসরি জনগণের হাতে থাকে, সেটি আরও বিরল। তার বক্তব্যে উপস্থিত জনতা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে।
নিজেকে একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে মামদানি জানান, এই আদর্শ থেকেই তিনি নগর পরিচালনা করতে চান। তার ভাষায়, প্রত্যাশা কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ তিনি মানবেন না। বরং সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশাসন গড়াই তার লক্ষ্য। সফলতা সব সময় নাও আসতে পারে, তবে সাহসের অভাব থাকবে না-এমন অঙ্গীকার করেন তিনি।
বিনা মূল্যে বাসসেবা, শিশু পরিচর্যা সহায়তা এবং বাড়িভাড়া কমানোর মতো প্রতিশ্রুতিগুলোই নির্বাচনে মামদানিকে জনপ্রিয় করে তোলে। অভিষেক অনুষ্ঠানে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি নতুন মেয়রের প্রতি জনসমর্থনেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নিউইয়র্কবাসী রায়হান রাশেদ বলেন, মাইনাস ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যেও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে এসেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন মেয়র বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
মামদানির শপথ গ্রহণ হয় দুই দফায়। প্রথম দফায় ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পরিত্যক্ত ওল্ড সিটি হল সাবওয়ে স্টেশনে তাকে শপথ পাঠ করান নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার বাবা অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি, মা চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার এবং স্ত্রী রমা দুওয়াজি।
দ্বিতীয় দফায় প্রকাশ্য অভিষেক অনুষ্ঠানে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। পরে শপথ পাঠ করান ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যাকে নিজের রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে মানেন মামদানি।
দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মামদানি সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের পর জারি করা সব নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন। এসব আদেশের মধ্যে একটি ছিল মেয়র কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ইসরায়েল বর্জন বা বিনিয়োগ প্রত্যাহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মামদানির সামনে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রায় ১০ লাখ বাসাবাড়িতে বিনা মূল্যের সেবা নিশ্চিত করতে আনুমানিক এক হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থ সংগ্রহে উচ্চবিত্তদের ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বললেও, এর জন্য অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সমর্থন জরুরি।
এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও রাজনৈতিক সমীকরণ সামলাতে হবে তাকে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে কেন্দ্রীয় তহবিল কমানোর হুমকি দিলেও, সাম্প্রতিক এক বৈঠকে তার প্রতি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন- যা রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এএডি/