ইরানে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বিক্ষোভ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকতে থাকা দেশটির বিভিন্ন শহরে লোকজন সড়কে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দোসর হয়ে কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের প্রধান বিচারপতি।
বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ার করে দেশটির প্রধান বিচারপতি বলেছেন, যারা দেশকে বিশৃঙ্খল করে দেওয়ার উসকানি দিচ্ছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হয়ে কাজ করছেন। ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। বুরুজের্দ, আর্সানজান, গিলান-এ-ঘার্বসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিয়েছেন। দক্ষিণের শহর শিরাজ থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া একটি ব্যারিকেড পার হয়ে যাচ্ছে। ব্যারিকেডে লেখা, ‘আমরা ক্ষুধার কারণে বিদ্রোহ করেছি।’
সম্প্রতি ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেন-এজেইয়ের একটি মন্তব্য সর্বশেষ এই বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে শত্রুকে সাহায্য করা ব্যক্তিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। মোহসেন-এজেই আরও বলেছিলেন, যদি কেউ দাঙ্গা বাঁধাতে বা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে রাস্তায় নামেন, অথবা তাদের সমর্থন করেন, তা হলে তাদের পক্ষে আর কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না। বিষয়টি এখন সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও পরিষ্কার। তারা (বিক্ষোভকারীরা) এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শত্রুদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।
মোহসেন-এজেই তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করছিলেন। ট্রাম্প গত সপ্তাহে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘তেহরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে হত্যা করে, যা তাদের রীতি, তা হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালাতে পুরোপুরি প্রস্তুত।’ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। গত রোববার তিনি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বলেছেন, ‘খুব সম্ভব আমরা এমন এক মুহূর্তে আছি, যখন ইরানের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে তুলে নিতে যাচ্ছেন।’
ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। বিশ্ববাজারে ইরানি রিয়ালের ব্যাপক দরপতন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাজনিত গভীর অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে তেহরানে গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা গত মাসের শেষ দিকে দোকানপাট বন্ধ করে প্রথম বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। তাদের সেই বিক্ষোভ এখন ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে হতাহতের কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। তবে মানবাধিকারকর্মীরা অন্তত ৩৬ জন নিহত ও ২ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছেন। আলজাজিরা স্বাধীনভাবে এ সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
ইরানে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে চলা এ বিক্ষোভের ১২তম দিনে সরকারবিরোধী প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংস সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। আগের দিনই দক্ষিণ-পশ্চিমের লর্ডেগান শহরে দুই পুলিশ নিহত হয়েছেন, জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওতে দেখা যায়, নিরাপত্তা বাহিনী গুলি ও কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে এবং প্রতিবাদকারীরা পাথর ছুড়ে প্রতিহত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বিক্ষোভ এখন দেশের ৩১ প্রদেশের ১১১টি শহর ও অঞ্চলে ছড়িয়ে গেছে। কমপক্ষে ৩৪ প্রতিবাদকারী ও চার নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন এবং ২,২০০-এর বেশি প্রতিবাদকারী আটক হয়েছেন। বিবিসি পার্সিয়ান ২১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের দোকানদাররা রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে সড়কে নামলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে জনরোষ আরও বেড়ে গেছে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে যোগ দেন। অনেক এলাকায় তারা সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। এই প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দমন-পীড়ন না চালাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা অস্ত্র হাতে নাশকতা বা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াবে, তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী হিসেবে নয়, বরং ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাফর ঘায়েমপানাহ বলেছেন, ‘বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না’ বলে প্রেসিডেন্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘যারা আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি বা ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশ স্টেশন ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে, তারা দাঙ্গাবাজ। আমাদের বিক্ষোভকারী আর দাঙ্গাবাজদের আলাদা করে চিনতে হবে।’
ইরানের সেনাপ্রধান জেনারেল আমির হাতামি সতর্ক করে বলেছেন, দেশের বিরুদ্ধে বাইরের যে কোনো হুমকির বিরুদ্ধে ইরান কঠোর জবাব দেবে। ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, হাতামি বলেছেন শত্রু কোনো ভুল করলে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে আরও কঠোর; আর তা গত জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হবে।
সর্বশেষ এই বিক্ষোভ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে ইরানে তিনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন। একই সময়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের মতো তো নয়-ই, এবারের বিক্ষোভ এখনও ২০২২-২৩ সালের আন্দোলনের মতো বড় আকার ধারণ করেনি। তবে অর্থনৈতিক এই বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
এমন অবস্থায় গত রোববার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তারা যদি অতীতের মতো মানুষ হত্যা শুরু করে, তা হলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠিন আঘাত আসতে পারে।’ অন্যদিকে নেতানিয়াহু ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় বলেন, আমরা ইরানি জনগণের সংগ্রামের পাশে আছি, তাদের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার দাবির সঙ্গে সংহতি জানাই।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলমান বিক্ষোভের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই সমর্থনকে ‘হস্তক্ষেপবাদী এবং প্রতারণামূলক’ অভিহিত করে নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সমর্থন ইরানের জনগণের প্রতি সহানুভূতি থেকে জানানো হয়নি। বরং সর্বোচ্চ চাপ, হুমকি এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতির সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ। এর লক্ষ্য সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেওয়া এবং দেশটিতে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা।
এ অবস্থায় ইরান শত্রুদের ওপর আগাম হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ইরানিয়ান ডিফেন্স কাউন্সিল এক বিবৃতিতে এ সতর্কবার্তা দিয়েছে। গত বছর ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের পর প্রতিরক্ষামূলক কৌশল পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছিল ইরানিয়ান ডিফেন্স কাউন্সিল। বিবৃতিতে কাউন্সিল জানায়, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ বা দেশটিতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে তা দাঁতভাঙা জবাব পাবে। শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর পাল্টা জবাব দেওয়া হবে না, বরং যেকোনো ‘দৃশ্যমান হুমকির লক্ষণ’কেও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা তাদের জন্য একটি লাল রেখা। যেকোনো আগ্রাসন বা শত্রুতামূলক আচরণ হলে পাল্টা জবাব হবে সমানুপাতিক, দৃঢ় ও চূড়ান্ত। ইরানের অভ্যন্তরে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার মানের চরম পতনের কারণে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সেই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে যখন দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখন এ বিবৃতি জারি করা হলো। যদিও বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
আগে থেকেই অস্থির হয়ে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের এমন হুঁশিয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্লোরিডায় ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন।
সময়ের আলো/এসকে/