নতুন বছরের প্রথম সাত দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্নস্থানে গুলিতে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুর্বত্তদের গুলিতে বিএনপির তিনজন নেতাসহ ৮ জন নিহত এবং কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১২ জনকে।
গত ৩ জানুয়ারি সকালে যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন (৫৫)। তিনি শংকরপুর ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে মোটরসাইকেলে এসে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদারকে (৪৮) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি রাউজান উপজেলা যুবদলের সদস্য এবং পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে স্টার হোটেলের পাশের একটি গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির (৪৪)। পুলিশ জানায়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে রায়হান খানকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে, ফরিদপুরে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে গলাকেটে, রাজধানীর বসুন্ধরায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে এবং হাজারীবাগে শিপন নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সাভারে এক ব্যবসায়ীকে চোখ উপড়ে ও লিঙ্গ কর্তন করে হত্যা এবং মাগুরায় গাঁজা সেবনে বাধা দেওয়ায় টিটো মণ্ডল নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে রাজশাহী ও নাটোরের পদ্মা চরাঞ্চলে দুই দফায় গুলিতে সোহেল রানা নামে দুই যুবক নিহত হয়। এ ঘটনায় তাদের স্ত্রীও আহত হয়েছেন। যশোরে প্রকাশ্যে গুলি করে রানা প্রতাপকে হত্যা, নেত্রকোনায় গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার এবং ঢাকার কদমতলীতে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কারণ হিসেবে মনে করছে পুলিশ। তবে একের পর এক সহিংস ঘটনায় জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২৩ দিনে এ অভিযানে ১৫ হাজার ৯ জন গ্রেফতার এবং ২১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে চালানো অভিযানে গ্রেফতার হয় ১২ হাজারের বেশি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ জন নিহত ও ৪ হাজার ৭৪৫ জন আহত হয়। মোট সহিংস ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪০১টি। সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যেও রাজনৈতিক সহিংসতার ঊর্ধ্বমুখী চিত্র উঠে এসেছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলছে, গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২৩ জন এবং ২০২৩ সালে ৯৬ জন নিহত হয়। আহতের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে ৭ হাজার ৫১১ ও ৯ হাজার ৩৭৯। আর মানবাধিকার সাংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, গত বছর রাজনৈতিক সংহিসতায় ৫৯৯টি ঘটনায় ৮৬ জন নিহত ও ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হয়, যার মধ্যে ৯৭ জনই গুলিবিদ্ধ হয়।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে যেভাবে গুলি, কোপাকুপি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাড়ছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি প্রমাণ করে যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মানবাধিকার রক্ষা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এখনই রাষ্ট্রকে কঠোর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
গত ২৯ ডিসেম্বর পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম আসন্ন নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে নির্দেশ দেন। সভায় ভার্চ্যুয়ালি সব জেলার পুলিশ সুপার, রেঞ্জ ডিআইজি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। এসব বিষয়ে আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বিরোধ থেকে কিছু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটছে, যা পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন। তবে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা গেলে সংঘাত কমে আসবে।
সময়ের আলো/জেডআই