ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে সামনের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে এবং বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ উপায়ে অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের দুদিন পর, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ইইউ ইওএম (ইউরোপিয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন) একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে এবং ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করবে। ২০০৮ সালের পর এটিই বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন।
ইইউ ইওএমের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস রোববার (১১ জানুয়ারি) ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
ইইউ ইওএম এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানায়, বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইইউ ইওএম) মোতায়েন করেছে। লাটভিয়ার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ও প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবসের নেতৃত্বে ইইউ ইওএম ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে কার্যক্রম শুরু করে এবং আজ (রোববার) ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকের আগমনের মাধ্যমে এর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে, যাদের বাংলাদেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় মোতায়েন করা হবে।
এতে আরও জানানো হয়, ২০০৮ সালের পর এটিই বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। পূর্ণ সক্ষমতায় এই মিশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সকল ২৭টি সদস্য দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ১১ জন বিশ্লেষক নিয়ে একটি কোর টিম, ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক, যাদের ভোটের ঠিক আগে মোতায়েন করা হবে, এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ও অংশীদার দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনের পর্যবেক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দল এই মিশনে যোগ দিয়ে এর কার্যক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে। নির্বাচনের দুই দিন পর, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ইইউ ইওএম একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে এবং ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করবে। প্রায় দুই মাস পর একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইইউ ইওএম’র সব পর্যবেক্ষক কঠোর আচরণবিধির অধীন এবং মিশনটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নীতিমালার ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ পরিচালনা করেন।
মিশনটি তাদের কার্যক্রম চলাকালে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও তার বাস্তবায়ন, নির্বাচনী প্রচারণা এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যে নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। এছাড়াও নারী, তরুণ প্রজন্ম ও ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য জনগোষ্ঠীসহ সকলের রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের সামগ্রিক পরিসর মূল্যায়ন করা হবে। ভোটারদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য ইইউ ইওএমের পৃথক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে। সামগ্রিকভাবে, ইইউ, ইওএম নির্বাচনগুলো জাতীয় আইন অনুযায়ী কতটা পরিচালিত হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানদণ্ড গ্রহণ করেছে, সেগুলোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা মূল্যায়ন করবে।
ইইউ ইওএমের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস, দেশে তার এই প্রথম সফরের সময় চলমান নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পেতে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনী অংশীজনদের সঙ্গে দেখা করেছেন। ইভার্স ইজাবস রোববার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারিত্বের গুরুত্বকে পুনরায় নিশ্চিত করে। এই নির্বাচনগুলোর জন্য আমাদের কারিগরি মূল্যায়ন তিনটি মূল নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়: স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং হস্তক্ষেপহীনতা। আমরা দীর্ঘমেয়াদি এবং দেশব্যাপী পর্যবেক্ষণের একটি শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসরণ করব। আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করব, তবে ফলাফল প্রত্যয়ন করব না। এই নির্বাচন একান্তই বাংলাদেশের জনগণের।
প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস ব্রিফিংয়ে জোর দিয়ে বলেন, ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে এই ঐতিহাসিক নির্বাচনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে এবং বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ উপায়ে অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমি আশা করি, এখানে আমাদের কাজ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।
অন্তর্ভূক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস বলেন, আমি মনে করি, আমাদের দৃষ্টিতে প্রথমত অন্তর্ভুক্তি মানে হচ্ছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের সামাজিক সব গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি; নারী, জাতিগত-ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মতো পক্ষগুলো যাতে অংশ নিতে পারে। আর অংশগ্রহণমূলক হওয়ার ক্ষেত্রে আমরা নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতির দিকে ভালোভাবে নজর রাখব। যার মাধ্যমে আমরা ইঙ্গিত পাব যে, বাংলাদেশের নাগরিকরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করছে।
বর্তমান পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের উপযোগী কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার প্রাথমিক আভাস হচ্ছে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুরূহ বিষয় হচ্ছে, একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকরভাবে মোতায়েন করা এবং অন্যদিকে, মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেওয়া। এই দুয়ের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে, সেদিকে আমরা মনোযোগ রাখব। সংসদ ও গণভোট একই দিন হওয়ার বিষয়ে ঝুঁকির দিক নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, গণভোট নয়, আমরা মূলত সংসদীয় নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ করব। কেননা ওটা আমাদের ম্যান্ডেটের বাইরে। তবে, যেহেতু দুটো বিষয় পরস্পর সংযুক্ত, নাগরিকরা ঠিকমত জেনে তাদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কি-না, সেদিকে নজর আমরা দেব। গণভোট যেহেতু অনেক দেশের জন্য একটা ইস্যু এবং সে কারণে এতে বিশেষ মনোযোগ আমরা দিব।
ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দেখছে কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইইয়াবস বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয়টি আমরা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে দেখব। উদাহরণস্বরূপ, গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকারের বিষয়ও আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। সংশ্লিষ্ট মিডিয়ায় প্রত্যেক প্রার্থী কতটা প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, সেটা বহু দেশেই একটা ইস্যু। ভোটে প্রার্থিতাদের নিবন্ধনের মতো বিষয়ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের আরেকটি দিক। আমরা জানি, প্রার্থিতার বিষয়ে আপিল চলছে। এদিকটাও আমরা পর্যবেক্ষণ করব। অতীতে ডিসি-এসপিদের ভোটে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গ টেনে এবারকার পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই নির্বাচনের সময়ে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আমরা অবশ্যই বিবেচনায় নেব। পাশাপাশি, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে অস্থির সময়ের পথ ধরে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আমরা আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করছি এবং এ প্রসঙ্গে সরকারের সঙ্গে আলাপ করছি। তবে, এক্ষেত্রে আমার কোনো আভাস দেওয়ার সময় এখনও আসেনি।
আরআর