হামাস অস্ত্র সমর্পণে অনীহা দেখানোয় আবারও লড়াই শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে পশ্চিম জেরুজালেম এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজার কিছু এলাকায় নতুন করে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেছে ইসরাইল। বর্তমানে গাজা কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত।
এক অংশে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ), অন্য অংশে হামাস। এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি রূপরেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও।
যেখানে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ এবং এর বিনিময়ে ১৪১ বর্গমাইল আয়তনের গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলের সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হামাসের অবস্থান। সূত্রের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, হামাস অস্ত্র সমর্পণের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি মানতে রাজি নয়। আর এই অনীহার কারণেই নতুন করে হামলা চালানোর কথা ভাবছে ইসরাইল। আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামাস ভারী অস্ত্র ছেড়ে দিতে প্রস্তুত হলেও ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র, যেমন রাইফেল সমর্পণ করতে চায় না। ইসরাইলের ধারণা, বর্তমানে হামাসের কাছে প্রায় ৬০ হাজার রাইফেল রয়েছে।
গত মাসে হামাস দাবি করে, তারা এখনও যুদ্ধবিরতিতে অঙ্গীকারবদ্ধ, যদিও তাদের ভাষায় ইসরাইল বারবার সেই চুক্তি লঙ্ঘন করছে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে বলে দেয়, ‘দখলদারিত্ব যত দিন থাকবে, তত দিন অস্ত্র ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ ইসরাইলি কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধের পর থেকে হামাস আবারও তাদের সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলছে। ক্ষতিগ্রস্ত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের কিছু অংশ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
পাশাপাশি যোদ্ধাদের বেতন দেওয়ার জন্য নতুন করে অর্থও পেয়েছে সংগঠনটি। তবে ইসরাইলি কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, এই মুহূর্তে হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আইডিএফ প্রবেশের কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই। পশ্চিম জেরুজালেম এখনও ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা কতটা এগোয়, তা দেখার অপেক্ষায় আছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণের জন্য ‘খুব অল্প সময়’ দেওয়া হবে। তা না হলে, তার ভাষায়, ‘তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।’ ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের আকস্মিক হামলার পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইল।
ওই হামলায় ইসরাইলের প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করা হয়। এরপর থেকে চলা যুদ্ধে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ইরানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই গাজায় আবারও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল। অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ইসরাইলি বাহিনীর রাতভর হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও সাতজন আহত হয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, রোববার ভোর পর্যন্ত দক্ষিণ গাজার রাফাহ ও খান ইউনিস, গাজা শহরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেইতুন এলাকা এবং অবরুদ্ধ উপত্যকার আরও কয়েকটি পাড়া-মহল্লায় হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।
এদিন খান ইউনিসে হাসপাতালে নেওয়ার পথে এক ফিলিস্তিনিকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে গুলি চালানো হয়। এতে ওই ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, গাজা শহরের জেইতুন এলাকার পূর্বদিকে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আরও দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন।
ওয়াফা আরও জানায়, গাজা শহরের তুফফাহ ও জেইতুন এলাকার পূর্বাংশে গোলাবর্ষণ এবং সামরিক যান থেকে ব্যাপক গুলি চালানো হয়েছে। পাশাপাশি মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর গাজার জাবালিয়া ও বেইত লাহিয়ায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়। উত্তর উপকূলীয় এলাকায় ইসরাইলি নৌযান থেকেও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
গাজা সিটি থেকে আলজাজিরার সংবাদদাতা তারেক আবু আজ্জুম বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। তার ভাষায়, কেন্দ্রীয় গাজা সিটি এবং পূর্বাঞ্চলজুড়ে ইসরাইলি ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির সীমারেখা হিসেবে নির্ধারিত ইয়েলো লাইন অতিক্রম করেও হামলা চালানো হচ্ছে। রাফাহ, খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চল এবং জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ব্যাপকভাবে ভবন ধ্বংস করা হচ্ছে। এই অভিযানগুলো মূলত ইসরাইলের সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বাড়ানোর চেষ্টা, যাতে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় তা চাপের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, বলেন তিনি।
এদিকে গাজায় চলমান মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। শনিবার চরম শীতের কারণে সাত দিনের এক ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে। মাহমুদ আল-আকরা নামের ওই নবজাতক মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় মারা যায়। দ্রুত তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইসরাইলি অবরোধের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি, আশ্রয় ও মৌলিক উপকরণের সংকট এই মৃত্যুর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে চিকিৎসা সূত্র উল্লেখ করেছে। চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় হামলা ও মানবিক বিপর্যয়ের এসব ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
তবে গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা ছেড়ে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে যেতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এর মধ্যেও চলছে ইসরাইলি হামলা। শনিবার হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ও গাজার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাসেম নাঈম বলেন, হামাস গাজার সরকারি প্রশাসন থেকে পুরোপুরি সরে যেতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদনের পর যুদ্ধবিরতি একটি আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছেন বলে অভিযোগ করেন এই হামাস নেতা। নাঈমের দাবি, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় শতাধিক হতাহত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়। এর মধ্যে নতুন খবর হলো ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল’ সোমালিল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইসরাইল। সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি এ অভিযোগ করেছেন। কথিত এই পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
শনিবার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিকি বলেন, ‘আমাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য আছে যে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের একটি নীলনকশা তৈরি করেছে।’ তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সোমালিল্যান্ডের প্রতি দেওয়া কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানান।
গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় ইসরাইল। সোমালিয়া এই পদক্ষেপকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর ‘সরাসরি আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহম্মাদ দাবি করেছেন, স্বীকৃতির বিনিময়ে সোমালিল্যান্ড ইসরাইলের তিনটি শর্ত মেনে নিয়েছে।
এগুলো হলো ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসন, এডেন উপসাগরীয় উপকূলে ইসরাইলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দেওয়া।
অন্যদিকে গত শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাদাম মাও নিং বেইজিংয়ে জানিয়েছেন, গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রকৃত বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করে চীন। চীনা মুখপাত্র জানান, বর্তমান গাজা পরিস্থিতি নিয়ে চীন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সব ধরনের বেসামরিক মানুষের ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কার্যক্রমের বিরোধিতা করে চীন। গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রকৃত বাস্তবায়ন, কার্যকরভাবে মানবিক সংকট হ্রাস এবং যত দ্রুত সম্ভব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের আশা করে চীন।
সময়ের আলো/এআর