গাজা শহরের উত্তরে আল-মাকুসি এলাকায় প্রবল বৃষ্টিপাত ও শীতকালীন ঝড়ে অস্থায়ী আশ্রয়স্থল হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। ছবি : আনাদুলু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থামেনি ইসরায়েলি হামলা। গাজায় কমেনি শিশুদের মৃত্যু, অপুষ্টি ও ঠান্ডাজনিত দুর্ভোগ। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েলি বিমান হামলা ও সহিংসতায় একদিকে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে; অন্যদিকে ভয়াবহ মানবিক সংকটে লাখো মানুষ ন্যূনতম আশ্রয়, চিকিৎসা ও খাদ্যের জন্য লড়াই করছে। শীতকালীন ঝড়, সহায়তা প্রবেশে বাধা এবং ভেতরে ভেতরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি মিলিয়ে গাজা এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
যুদ্ধবিরতির পরও ১০০ শিশু নিহত : যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় বিমান হামলা ও সহিংসতায় অন্তত ১০০ শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বার্তা সংস্থা এএফপি গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার গাজা সিটি থেকে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি বলেন, গত অক্টোবরের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একজন করে শিশু নিহত হচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী এসব শিশু নিহত হয়েছে- বিমান, ড্রোন, ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষণ এবং সরাসরি বন্দুক হামলায়। এল্ডার আরও বলেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও শিশুদের এভাবে প্রাণ হারানো গাজায় চলমান সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার প্রমাণ দিচ্ছে।
অপুষ্টির শিকার হাজার হাজার শিশু : গাজা উপত্যকায় শিশুর অপুষ্টি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি বছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৫ হাজার শিশুর অপুষ্টির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে জাতিসংঘ। শীতকালীন আবহাওয়া মানবিক সহায়তায় যে সামান্য অগ্রগতি হয়েছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এ খবর জানিয়েছে। মার্কিন সময় সোমবার নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক বলেছেন, মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দফতরের (ওসিএইচএ) তথ্য অনুযায়ী গাজা উপত্যকার মানবিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত ভয়াবহ। কঠোর আবহাওয়া পরিস্থিতি মানবিক সহায়তার অগ্রগতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
দুজারিক আরও জানিয়েছেন, পুষ্টি খাতে কাজ করা জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে বিপুলসংখ্যক শিশুকে জরুরি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে শনাক্ত করছে। গত মাসে আমাদের অংশীদাররা ৭৬ হাজারের বেশি শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৯০০টি তীব্র অপুষ্টির ঘটনা শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ৮২০টিরও বেশি ছিল গুরুতর তীব্র অপুষ্টির ঘটনা। তিনি আরও যোগ করেছেন, এর ফলে ২০২৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা ভুক্তভোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৫ হাজারে।
দুজারিক আরও বলেছেন, জাতিসংঘের অংশীদাররা ২৮ হাজার পরিবারের মধ্যে তাঁবু, ত্রিপল, কম্বলসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বৃষ্টি-ঝড় অব্যাহত থাকায় এখনও ১১ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন, কারণ অনেক আশ্রয়স্থল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাঁবু কেবল সাময়িক সমাধান। জরুরি অবস্থা থেকে প্রাথমিক পুনরুদ্ধারের দিকে যেতে হলে আরও সরঞ্জাম প্রয়োজন। যেমন- টুলকিট, সিমেন্ট, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজন টেকসই অর্থায়ন।
কঠোর আবহাওয়ার প্রভাব শিশুদের ওপর কতটা ভয়াবহ, সে বিষয়ে আলোকপাত করে দুজারিক বলেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এবং বছরের শেষ পর্যন্ত আমাদের অংশীদাররা শীতকালীন সহায়তার অংশ হিসেবে ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি শিশুকে শীতের পোশাক এবং ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি জোড়া জুতা বিতরণ করতে পেরেছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ও বন্ধুসুলভ পরিবেশ তৈরিতে গাজাজুড়ে ১৫০টি বিশেষায়িত তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে দুজারিক বলেছেন, জাতিসংঘের শিক্ষা অংশীদাররা ৩৫ হাজার গাজাবাসী শিক্ষার্থীর জন্য আরও ১৮টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেছে। এ নিয়ে বর্তমানে চালু অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪০টি, যেখানে প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার শিশু পড়াশোনা করছে। গাজায় ইসরায়েলের চলমান ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে দুজারিক বলেছেন, আমরা চাই গাজায় যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তার ধ্বংস বন্ধ হোক। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে যাক, যাতে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা যায়।
তীব্র ঠান্ডায় বাড়ছে মৃত্যু : শক্তিশালী শীতকালীন ঝড়ে গাজায় অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তীব্র ঠান্ডা, ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্দশা আরও বেড়েছে, যারা অস্থায়ী ও নড়বড়ে আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। গাজার সিভিল ডিফেন্স সতর্ক করে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চললেও ইসরায়েল মানবিক সহায়তা ও আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশে বাধা দেওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। চরম শীতের কারণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে এক বছর বয়সি একটি শিশুও রয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত চারটি ভবন ঝড়ের সময় ধসে পড়ে আরও চারজন প্রাণ হারান। গাজা সিটিতে এসব মৃত্যুর বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রবল বাতাস দুর্বল হয়ে পড়া ভবনগুলোকে ভেঙে ফেলেছে।
গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে, বিশেষ করে শিশুদের। ঝড়ের কারণে অনেক তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ উড়ে যাওয়ায় শত শত জরুরি সহায়তার ফোনকল পাওয়া গেছে। সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, গাজার উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী হাজারো পরিবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তা ও মানবিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ইসরায়েলের অব্যাহত নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রয়োজনীয় আশ্রয়, চিকিৎসাসামগ্রী ও ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না, যা ইতিমধ্যেই ভয়াবহ মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য হাহাকার : গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক সংকটের মধ্যে জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য এখনও ১৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের স্থানান্তর প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস। তিনি এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আরও বেশি রোগী গ্রহণের জন্য দেশগুলোর দরজা খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। গত সোমবার নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে দেওয়া এক বার্তায় আধানম গেব্রিয়েসুস বলেন, ক্যানসার, ট্রমা কেয়ারসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগে আক্রান্ত বহু মানুষ গাজায় চিকিৎসার অভাবে চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তার মতে, সময়মতো চিকিৎসা স্থানান্তর নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ডব্লিউএইচও প্রধান জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি দেশে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য গাজা থেকে ১০ হাজার ৭০০ জনের বেশি রোগীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে চার হাজার শিশুসহ বিপুলসংখ্যক রোগী এখনও জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ডব্লিউএইচও গাজা থেকে রোগীদের জন্য আরও দেশকে তাদের সীমান্ত ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ উন্মুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে। পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীরে চিকিৎসা স্থানান্তর পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
হামাস পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হত্যা : ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস পুলিশের ফৌজদারি ইউনিটের প্রধান মাহমুদ আল আস্তালকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ইসরায়েল সমর্থিত একটি ফিলিস্তিনি মিলিশিয়া গোষ্ঠী এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। ঘটনার জন্য হামাস ‘ইসরায়েলের সহযোগীদের’ দায়ী করেছে। সোমবার এক বিবৃতিতে গাজার হামাস পরিচালিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্দুকধারীরা চলন্ত গাড়ি থেকে গুলি চালিয়ে মাহমুদ আস্তালকে হত্যা করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, খান ইউনিসের পূর্ব দিকে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকাভিত্তিক হামাসবিরোধী মিলিশিয়া গোষ্ঠীর নেতা হুসাম আল আস্তাল তার ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও পোস্ট করে এ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।
তার ‘আল আস্তাল’ উপাধি ও নিহত পুলিশ কর্মকর্তার নামের শেষাংশ একই। এই উপাধিটি গাজায় খুব প্রচলিত। ভিডিওতে কালো সামরিক পোশাক পরা অত্যাধুনিক রাইফেল হাতে ধরা অবস্থায় হুসাম আস্তাল বলেন, যারা হামাসের সঙ্গে কাজ করছেন, নিহত হওয়াই আপনাদের পরিণতি। মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। রয়টার্স জানিয়েছে, কী পরিস্থিতিতে হামলার ঘটনাটি ঘটেছে তারা তা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি। এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ওই এলাকায় কোনো অভিযানের বিষয়ে কিছু জানে না।
রয়টার্স লিখেছে, বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবির্ভাবে (যদিও এখন ছোট ও স্থানীয়) গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসের ওপর বাড়তি চাপ যুক্ত হলো আর এটি বিভক্ত গাজাকে ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। ইসরায়েলের সঙ্গে দুই বছরের যুদ্ধে গাজা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে। গাজার ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠা এসব গোষ্ঠীর প্রতি স্থানীয়দের তেমন সমর্থন নেই। তবে এসব গোষ্ঠীর দাবি, তারা ইসরায়েলের আদেশে কাজ করে না। ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করে বেশ কিছু মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ইতিমধ্যেই তা প্রকাশ্যে কার্যকর করেছে হামাস। অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এক যুদ্ধবিরতির অধীনে গাজা ভূখণ্ডের প্রায় অর্ধেক এলাকা থেকে সরে গেছে ইসরায়েলি বাহিনী। কিন্তু অন্য অংশ এখনও তাদের সেনাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।
গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই এখন হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে বসবাস করছে। তাদের অধিকাংশেরই ঠাঁই হয়েছে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা তাঁবুতে আর বাকিরা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। হামাসের চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারা তাদের হাজার হাজার যোদ্ধাকে নেতৃত্ব দিয়ে চলছে। অন্যদিকে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তৎপরতার চালানোর অনুমোদন দিচ্ছে ইসরায়েল।
সময়ের আলো/এনএ