গাজায় গণহত্যায় ইসরায়েলকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তার গোপন নথি ফাঁস হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, গাজায় চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় উপায়ে সমর্থন দিতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। সম্প্রতি এমিরেটলিকস নামের একটি অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্মের হাতে এ সংক্রান্ত নথি এসেছে। আল ধাফরা অঞ্চলের প্রতিনিধি ও ইউএই রেড ক্রিসেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান হামদান বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এটি প্রণয়ন করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। খবর জেরুজালেম পোস্টের
নথির শুরুতে বলা হয়, ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলকে সহায়তা করার জন্য ইউএই জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ডের নির্দেশ অনুসরণে লোহিত সাগর অঞ্চলে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিগুলোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিশেষ করে ইয়েমেনের দক্ষিণ লোহিত সাগরের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ইসরায়েলের সহায়তায় প্রস্তুত করা হয়। নথিতে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে শক্তিশালী করার জন্য এবং ফিলিস্তিনে যাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (হামাস), তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ইউএই সহযোগিতা করবে। এই সহযোগিতা চলবে যতক্ষণ না সন্ত্রাসীরা পরাজিত হয়।
নথিতে ইসরায়েলকে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের গোয়েন্দা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহেরও উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া কাতার এবং কুয়েতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তারা ফিলিস্তিনে যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, যা ইউএই-এর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইউএই ও ইসরায়েলের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্পর্ক স্থাপন হয়। এরপর থেকে ইসরায়েল ও ইউএইর মধ্যে নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়েছে। ইউএইর সেনাবাহিনী ইসরায়েলের সহযোগিতায় ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বর্তমানে আবুধাবি তেল-আবিবের অন্যতম বড় আরব বাণিজ্যিক অংশীদার। ইউএই-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালে ইসরায়েলকে এক কোটি ৭১ লাখ ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা গাজায় চলমান যুদ্ধের মধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ইউএইর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের শীর্ষ অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণ করে।
যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প পরিকল্পনার ২য় ধাপ শুরু : গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সময় বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এ ঘোষণা দিয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। এই ঘোষণা এমন এক সময় এসেছে যখন প্রথম পর্যায়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেমন ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি, এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নতুন ধাপটি শুরু থেকেই জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ধাপে গাজায় একটি অস্থায়ী টেকনোক্রেটিক ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠন করা হবে। এর মাধ্যমে নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, কাতার ও তুরস্কের যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ১৫ সদস্যের এই ফিলিস্তিনি কমিটির নেতৃত্ব দেবেন আলি শাথ। তিনি পশ্চিমা সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী এবং শিল্পাঞ্চল উন্নয়নবিষয়ক দায়িত্বে ছিলেন। এই কমিটিকে বোর্ড অব পিস নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তত্ত্বাবধান করবে। যা গাজাকে অস্থায়ীভাবে শাসন করবে। গত অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাস ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছে।
রয়টার্সের সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, বোর্ড অব পিসের পক্ষে মাঠপর্যায়ে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলাই মøাদেনভ। তালিকায় বেসরকারি খাত ও এনজিও খাতের প্রতিনিধিদের নামও রয়েছে। তবে উইটকফ কমিটির সদস্য সংখ্যা বা নাম প্রকাশ করেননি। আলি শাথ এক রেডিও সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নতুন কমিটি প্রথমে গাজায় জরুরি মানবিক সহায়তার দিকে মনোযোগ দেবে। এর মধ্যে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা অন্যতম। তিনি আরও বলেছেন, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন ভূমি তৈরির ধারণার মাধ্যমে গাজার পুনর্গঠন সম্ভব হতে পারে।
জাতিসংঘের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি পুরোপুরি পুনর্গঠনে অন্তত ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, এমনকি তা আরও দীর্ঘায়িতও হতে পারে। স্টিভ উইটকফ আরও জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ধাপে গাজার পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠন শুরু হবে। যার মূল লক্ষ্য হবে অনুমোদনহীন সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র কেড়ে নেওয়া। হামাস অস্ত্র ত্যাগে অস্বীকৃতি জানালেও গত অক্টোবরে তারা গাজা শাসনভার টেকনোক্রেটিক কমিটির হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের এক নেতা বলেছেন, গাজার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এক ব্যবস্থা, এক আইন ও এক বৈধ অস্ত্র- এই নীতির ভিত্তিতে। রয়টার্সের সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনার জন্য হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর নেতারা বর্তমানে কায়রোতে অবস্থান করছেন। মিসরীয় সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন হামাসের নিরস্ত্রীকরণ। ইসরায়েলের আরও সেনা প্রত্যাহার এই নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত হলেও হামাস বলেছে, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তারা অস্ত্র ছাড়বে না।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গাজায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্গঠন এবং দৈনন্দিন শাসনব্যবস্থা নিয়ে পরবর্তী ধাপ কী হবে তা নিয়ে এখনও গভীর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধানের উপদেষ্টা তাহের আল-নুনু জানান, কায়রোর আলোচনায় রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খোলা, মিসরের অংশে আটকে থাকা ত্রাণ গাজায় প্রবেশ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার- এই তিনটি বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গাজায় শান্তি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে হামাস মধ্যস্থতাকারী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি ভণ্ডুল করার চেষ্টা করার অভিযোগ করেন। তবে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা কান জানায়, গাজার পূর্বাঞ্চলের তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত বাফার জোনকে কৌশলগত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করছে ইসরায়েল, যা তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চায়। বর্তমানে গাজার ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা ইসরায়েলি সামরিক দখলে রয়েছে।
ফিলিস্তিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন আল-শেখ গাজার পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, গাজার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সঙ্গে যুক্ত করা উচিত, যাতে ‘একটি ব্যবস্থা, একটি আইন ও একটি বৈধ অস্ত্র’- এই নীতি বজায় থাকে। যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, তুরস্ক ও কাতার এক যৌথ বিবৃতিতে এই উদ্যোগকে গাজার স্থিতিশীলতা ও মানবিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে উল্লেখ করেছে। তবে দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের জনসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে এই কমিটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, গাজা পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ, যা সম্পন্ন হতে বছর লেগে যাবে। এখন পর্যন্ত খুব অল্প অর্থই প্রতিশ্রুত হয়েছে।
গাজা সিটি থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খুদারি জানান, চুক্তি হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনও ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে, হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। চুক্তিতে নির্ধারিত প্রতিদিন ৬০০ ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে তা কখনোই হয়নি। আলজাজিরার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, এই চুক্তি মূলত সাজানো। ১৯৯১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় যে শান্তি প্রক্রিয়া হয়েছে, তার বেশির ভাগই ছিল ইসরায়েলের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট।
সময়ের আলো/এসকে/