গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবিকে এবার সরাসরি নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার হুমকি ও শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা বাণিজ্যিক পদক্ষেপের কথা ভাবছে। সবমিলে একটি বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। এতে ন্যাটোর ঐক্য টিকে থাকার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বাজারে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প ন্যাটোভুক্ত দেশ ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা জোরদার করেছেন। এ পথে বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। এর জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এই বিরোধ ন্যাটো জোটকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে; যে জোটটি কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা নিরাপত্তার ভিত্তি। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যয় না করা মিত্রদের রক্ষা না করার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের কারণে ন্যাটো আগেই চাপে ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নোবেল না পাওয়ার পর তিনি আর ‘শুধু শান্তির কথাই ভাবেন না।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ বাণিজ্য যুদ্ধের আশঙ্কা : সোমবার গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই বিরোধ ইউরোপের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার। গত বছর ট্রাম্পের কড়া শুল্কের পর দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল, এই বিরোধ তা ভেঙে দিতে পারে।
রয়টার্সের হাতে আসা নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরেকে পাঠানো এক লিখিত বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের দেশ যখন ৮টির বেশি যুদ্ধ থামানোর জন্য আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়নি, তখন থেকে আমি আর নিজেকে শুধু শান্তির কথা ভাবতে বাধ্য মনে করি না। শান্তি অবশ্যই প্রধান থাকবে, তবে এখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী ভালো ও সঠিক, সেটাও ভাবতে পারি।’
বার্তায় ট্রাম্প আবারও অভিযোগ করেন, ডেনমার্ক রাশিয়া বা চীনের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে পারবে না।
তিনি লেখেন, তাদের ‘মালিকানার অধিকার’ই বা কোথা থেকে এলো?” যোগ করেন, টিকেএমএসের ।
শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পাশাপাশি ব্রিটেন ও নরওয়ের ওপর ধাপে ধাপে শুল্ক আরোপ করা হবে—যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কেনার অনুমতি দেওয়া হয়।
ইইউ বলছে, ব্ল্যাকমেইল মেনে নেওয়া হবে না : ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে এক জরুরি সম্মেলনে বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। একটি বিকল্প হলো ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (১০৮ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্কের একটি প্যাকেজ, যা ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হতে পারে। আরেকটি বিকল্প হলো ‘অ্যান্টি-কোয়েরশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (এসিআই )। এটি কখনো ব্যবহার করা হয়নি। এর মাধ্যমে সরকারি দরপত্র, বিনিয়োগ বা ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে। এমনকি সেবা খাতের বাণিজ্যও সীমিত করা সম্ভব; যেখানে ডিজিটাল সেবাসহ যুক্তরাষ্ট্রের ইইউর সঙ্গে উদ্বৃত্ত রয়েছে।
ইইউ জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সব পর্যায়ে’ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসিআই ব্যবহারের বিষয়টি একেবারে বাদ দেওয়া হয়নি। এই কূটনৈতিক তৎপরতা দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বড় আলোচ্য বিষয় হতে পারে। সেখানে ট্রাম্প বুধবার মূল বক্তৃতা দেবেন। ছয় বছরে এই ফোরামে তার প্রথম উপস্থিতি।
বার্লিনে এক বৈঠকে জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল ও ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেস্ক্যুর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও স্পষ্ট ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ার অঙ্গীকার করেন।
ক্লিংবাইল বলেন, ‘জার্মানি ও ফ্রান্স একমত আমরা ব্ল্যাকমেইলের কাছে নত হব না।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মিত্রদের মধ্যে শান্ত আলোচনা চালানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক পদক্ষেপ ভাবছেন; এমনটা তিনি বিশ্বাস করেন না। ‘শুল্কযুদ্ধ কারও স্বার্থে নয়,’ বলেন স্টারমার। তিনি ইঙ্গিত দেন, নতুন মার্কিন শুল্ক আরোপ হলেও ব্রিটেন পাল্টা ব্যবস্থা নাও নিতে পারে।
অর্থনৈতিক ধাক্কা ও অনিশ্চিত ন্যাটো : ট্রাম্পের হুমকিতে ইউরোপের শিল্প খাত কেঁপে উঠেছে এবং আর্থিক বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধের অস্থিরতা ফিরে আসতে পারে; এই আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ মুদ্রার দিকে ঝুঁকছেন। সোমবার ইউরোপীয় শেয়ারবাজার পড়ে গেছে, আর ডলারও দুর্বল হয়েছে।
সিডনিভিত্তিক আইজি সংস্থার বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, ‘এই নতুন উত্তেজনা ন্যাটো জোট ভেঙে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে গত বছরের বাণিজ্য চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।’
বিশ্বের শীর্ষ অপরমাণু সাবমেরিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিকেএমএসের প্রধান নির্বাহী অলিভার বুরখার্ড বলেন, ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের এই পরিবর্তন ইউরোপকে নিজের শক্তির দিকে মনোযোগী হতে এবং আরও স্বাধীন হওয়ার পথ খুঁজতে উৎসাহিত করা উচিত।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘অবশ্যই এর চেয়ে সুন্দর উপায় থাকতে পারত। কিন্তু আমার ভাষায় বলতে গেলে; এটা যেন পায়ে একটা লাথি, যা বুঝিয়ে দেয় ভবিষ্যতে আমাদের আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে পারে।’
এফআর