ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিলে খাদ্যসামগ্রীসহ মৌলিক জিনিসপত্র প্রবেশ করতে শুরু করেছে গাজা উপত্যকায়। বাস্তুচ্যুত এই ফিলিস্তিনি নারীর ভাগ্যে দীর্ঘদিন পর মিলেছে রুটি। মঙ্গলবার নুসেইরাত শরণার্থী শিবির থেকে তোলা। ছবি : আনাদুলু ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাসহ পুরো বিশ্বকেই যেন মাফিয়া বসের মতো শাসন করে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ এ যেন সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যোগ না দিলে নানা শুল্কারোপের হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি দেশ এতে সাড়া দিয়েছে মরক্কো, আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, হাঙ্গেরি ও ভিয়েতনাম।
এই বোর্ডে যোগদানের মূল্য ধরা হয়েছে এক বিলিয়ন ডলার। তার ওপর সন্দেহ রয়েছে, এটি জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি অগোছালো উদ্যোগ মাত্র। ফলে খুব বেশি দেশ যে এতে ঝাঁপিয়ে পড়বে না, সেটিই স্বাভাবিক। বোর্ড অব পিসের পেছনে রয়েছে একটি প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ড। সেখানে এমন ব্যক্তিদের আধিক্য, যারা গাজায় গণহত্যা ঘটেনি এবং ঘটছেও না এমন দাবি করে এসেছেন। এই তালিকায় আছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ওয়াল স্ট্রিটের অর্থলগ্নিকারী মার্ক রোয়ান। রোয়ান ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে চাপ প্রয়োগের জন্য পরিচিত। এই বোর্ডের সদস্যদের আরেকটি মিল হলো- মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে তাদের গভীর অজ্ঞতা। মিডল ইস্ট আইতে এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এভাবেই লিখেছেন পত্রিকাটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট।
নির্বাহী বোর্ডে একমাত্র যিনি অঞ্চলটির সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার দাবি করতে পারেন, তিনি ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। যদিও ইরাক আক্রমণ করে সাত বছরের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ডেকে আনা যদি ‘অভিজ্ঞতা’ বলে গণ্য হয়, তবে সেই দাবি টেকে। তবে ব্লেয়ার আসলে নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই প্রতিনিধিত্ব করেন না। ব্রিটিশ সরকার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে তারা সচেতন। নভেম্বরে ব্লেয়ারের নাম প্রথম সামনে আসার পর ব্রিটেনের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ব্লেয়ারের সাবেক চিফ অব স্টাফ জোনাথন পাওয়েল ব্যক্তিগতভাবে জানান, ব্লেয়ার ব্রিটিশ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নন।
মিডল ইস্ট আইকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, পাওয়েল সক্রিয়ভাবে ব্লেয়ারের এই মনোনয়নের বিরোধিতা করেছিলেন। পাওয়েলের অবস্থান মূলত ব্রিটিশ ‘ডিপ স্টেট’-এর মনোভাবই তুলে ধরে। যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্লেয়ারের বারবার আলোচনায় ফেরার চেষ্টাকে ঘৃণার চোখে দেখে।
ব্লেয়ারকে সমর্থন নয় : পররাষ্ট্র দফতরের ভেতরের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানায়, এই তথ্য পুরোপুরি সঠিক। বিষয়টি আদৌ বিবেচনার তালিকায় নেই। ব্লেয়ারের ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে কোনো পদ নেই। টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে তিনি যা করছেন, তা একজন ব্যক্তিগত নাগরিক হিসেবেই। যোগাযোগ থাকতে পারে, কিন্তু তিনি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নন। কেউ যদি উল্টোটা দাবি করত, আমি বিস্মিত হতাম। ব্লেয়ার ভেতরে না বাইরে- এ প্রশ্নটাই কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি কি আদৌ কখনো বাইরে ছিলেন? তবে বোর্ডের অন্যরা আরও ভয়াবহ- কুশনার, উইটকফ, রুবিও। তাদের খুব কমজনই ফিলিস্তিন সম্পর্কে কিছু জানেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ইরাক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং ২০২০ সালেও যুদ্ধটিকে অবৈধ বলা কিয়ার স্টারমার অত্যন্ত সতর্কভাবে ট্রাম্পের বোর্ডে ব্লেয়ারকে ব্রিটেনের প্রতিনিধি হিসেবে সমর্থন দেওয়া এড়িয়ে গেছেন। তিনি ব্লেয়ারকে ‘একজন মহান নেতা’ এবং বোর্ডে ‘বড় অবদান রাখবেন’ বলে প্রশংসা করলেও দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে সমর্থন করার কথা বারবার এড়িয়ে যান। মিডল ইস্ট আই জোনাথন পাওয়েলের মন্তব্য নিয়ে কেবিনেট অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রকাশনার সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি। পররাষ্ট্র দফতরও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
সোমবার স্টারমার বলেন, ব্রিটেন মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বোর্ড অব পিস নিয়ে আলোচনা করছে। ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস সনদ অনুযায়ী নির্বাহী বোর্ডের প্রতিটি সদস্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। অর্থাৎ গাজার ওপর তাদের বাস্তব ক্ষমতা থাকবে। তবে এর নিচে আরেকটি নির্বাহী সংস্থা রয়েছে, যার কার্যত কোনো ক্ষমতাই নেই। এই বিভ্রান্তিকর কাঠামোর নাম দেওয়া হয়েছে ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’। এতে প্রতিষ্ঠাতা বোর্ডের সাত সদস্যের মধ্যে চারজন রয়েছেন। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, কাতারের মন্ত্রী আলি আল-থাওয়াদি এবং মিসরের গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল হাসান রাশাদ। এই তিন দেশ গাজা সম্পর্কে জানে। কিন্তু বাস্তবে তুরস্ক, কাতার ও মিসরকে এখানে আনা হয়েছে সাজসজ্জার উপকরণ হিসেবে।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে এই বোর্ড, ‘গাজার জনগণের জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কার্যকর শাসন ও উন্নতমানের সেবা প্রদানে সহায়তা করবে।’ এই বক্তব্যের অর্থ সবকিছু হতে পারে, আবার কিছুই নাও হতে পারে। এখানে লক্ষণীয়, সৌদি আরব এই উদ্যোগ থেকে দূরে থাকছে এবং সেটিই বুদ্ধিমানের কাজ।
একটি গভীরভাবে সমস্যাযুক্ত ইতিহাস : বুলগেরিয়ার কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভকে গাজার ‘হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিভাষায় এটি কার্যত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সমতুল্য। তার পাশে থাকছেন একদল ‘উপদেষ্টা’, যাদের সাম্প্রতিক ইতিহাস গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। যেমন ব্যবসায়ী ও রাব্বি আরিয়ে লাইটস্টোন। তিনি বসতি স্থাপনকারীদের ঘোর সমর্থক এবং ইসরায়েল-সমর্থিত ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি গুলিতে দুই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
সবচেয়ে নিচের স্তরে রয়েছে যে টেকনোক্র্যাটিক সরকার গাজা শাসন করবে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন গোষ্ঠী যে নামগুলো প্রস্তাব করেছিল, তার মধ্যে মাত্র দুজন তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্রটি নিরাপত্তা প্রধান। সামি নাসমান, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা, হামাস নেতাদের হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্র এবং ‘বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়ার’ অভিযোগে গাজার একটি আদালতে অনুপস্থিতিতে ১৫ বছরের সাজা পেয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসনে আছেন এবং নিকট ভবিষ্যতে তার ফেরার সম্ভাবনা নেই। এমন চরিত্রদের নিয়ে গঠিত কাঠামো থেকে ভালো কিছু আশা করা কি বাস্তবসম্মত?
উইটকফ দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন ঠিক যেভাবে তিনি প্রথম যুদ্ধবিরতির কথা বলেছিলেন- সব দায় চাপিয়েছেন হামাসের ওপর। তার বক্তব্যে দ্বিতীয় ধাপের মূল লক্ষ্য বলা হয়েছে গাজার পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, বিশেষ করে ‘অননুমোদিত সব সশস্ত্র ব্যক্তির অস্ত্র জমা দেওয়া’। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে হামাস পুরোপুরি মেনে চলবে। ‘তা না হলে কঠোর পরিণতি হবে।’ ইসরাইলের কোনো দায়ের কথা তিনি একবারও বলেননি। ইয়েলো লাইন থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে, যেখানে ইসরাইল বরং অগ্রসর হয়ে এখন গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা দখল করে আছে। অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর এক হাজারের বেশি লঙ্ঘন এবং প্রায় ৪৫০ ফিলিস্তিনির মৃত্যুর কথাও তিনি স্বীকার করেননি। ব্লেয়ারের বক্তব্যও একই সুরে বাঁধা। তার মতে, গাজায় যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা ছিল ‘অসাধারণ সাফল্য’। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে- এমন ঘোষণাও দেন তিনি।
গাজার মানুষের কাছে এটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর খবর। কারণ প্রতিদিনের বিমান হামলা ছাড়াও তারা ভয়াবহ শীত, বন্যা এবং এক লাখের বেশি তাঁবু ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল এখনও খাদ্য ও পুনর্গঠন সহায়তা আটকে রেখেছে। রাফাহ সীমান্তে দুই দিকের চলাচলও অনুমোদন দিচ্ছে না। ফলে নতুন টেকনোক্র্যাটিক কমিটিকে গাজায় নয়, কায়রোতে বৈঠক করতে হচ্ছে।
একটি বিকল্প বাস্তবতা : ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতির শর্ত ভেঙে চলেছে। কিন্তু ব্লেয়ার যেন ভিন্ন এক বাস্তবতায় বাস করেন। সেখানে গণহত্যা হয়নি, হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে, অথচ দখলদারিত্ব বহাল থাকবে। আইআরএর সঙ্গে শান্তি আলোচনায় পাওয়েল জানতেন ক্ষমতা ভাগাভাগি ছাড়া অস্ত্র ত্যাগ সম্ভব নয়। আজ সেই একই যুক্তি তিনি হামাসের ক্ষেত্রে অস্বীকার করছেন। ব্লেয়ার বলেন, আমরা এমন একটি গাজা চাই, যা আগের মতো নয়, বরং যেমন হওয়া উচিত। কার নির্দেশে? এমন এক ইসরায়েলের নির্দেশে, যে গাজাকে নরকে পরিণত করে ফিলিস্তিনিদের তাড়াতে চায়?
ব্লেয়ার তার বক্তব্যে একবারও ‘ফিলিস্তিন’ বা ‘ফিলিস্তিনি’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। পাওয়েল ঠিকই এই প্রতারণা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। বাস্তবতা হলো, কিছুই বদলাবে না। হামাস বা ইসলামিক জিহাদের যোদ্ধাদের জন্য নিরস্ত্রীকরণ মানে আত্মহত্যা। অবরোধ চলবে। ইসরাযেল গাজার অর্ধেকের বেশি দখলে রাখবে। আন্তর্জাতিক বাহিনী আসবে না। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ তাঁবুতেই বাঁচবে।
যারা এই বিস্ফোরণের পথ তৈরি করেছে, তাদেরই এনে শান্তি আনার আশা করা উন্মত্ততা নয়- এটি অপরাধ। গাজার গণহত্যার নকশাকার নেতানিয়াহুকে শান্তি বোর্ডে বসানো যেমন, তেমনি বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার নায়ক মিলোসেভিচ, কারাদজিচ ও মøাদিচকে ডেটন চুক্তিতে আমন্ত্রণ জানানোর সমান। ফিলিস্তিনিরা এই বোর্ড অব পিসকে ইতিহাসের ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলবে, ট্রাম্পের নাম মুছে যাওয়ার অনেক আগেই।
সময়ের আলো/এনএ