জন্মের পর মেয়ের নাম রেখেছে চম্পাবতী। বাবা ডাকে চম্পা। এখনও ছোট চম্পাবতী। সবে চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেছে এ বছর। পহেলা বৈশাখ এলে দীঘির পাড়ে মেলা বসে প্রতি বছর। এ বছরও বসেছে।
ছোট-বড় সব শিশুর কী আনন্দ। সবাই মেলায় ছুটছে। চম্পাবতী বাবাকে বলে, বাবা মেলায় যাব। যাবেতো! হাতের কাজটা শেষ করে যাব। বাবা বলে।
-সবাই চলে যাচ্ছে আমরা কখন যাব?
- যাব, যাবরে মা। তুই তৈরি হ!
বাবা হাতের কাজ শেষ করে বলে, চম্পাবতী চল মা।
মেলায় পৌঁছে অবাক চম্পাবতী। মানুষের ঢল। কত কিছু। দোলনা, মাটির পুতুল, নানা রঙের ঘুড়ি, বাহারি খাবার দোকান, মলা, মুড়ি, খই, চিনি বরবটি আরও কত কী। ছোট শিশুরা এদিক-ওদিক ছুটছে। কেউ কিনছে মাটির পুতুল, কেউ প্লাস্টিকের রংবেরঙের গাড়ি কিনছে। কেউ আবার ঘুড়ি। ওসব দিকে চম্পাবতীর চোখ নেই। তার দৃষ্টি একটি টিভির মতোন বাক্সের দিকে। সেখানে দুটো বড় খোঁপ। দুটো ছেলে চোখ দিয়ে দেখছে। দেখে হাসছে। চম্পাবতীর কৌতূহল বাড়ে। বাবাকে বলে, বাবা ওটা কী? ওই ছেলে দুটো ওখানে কী দেখছে!
বাবা দেখে বলে, ওটা বায়োস্কোপ। তুই দেখবি, চল।
চম্পাবতী এককথায় রাজি। কৌতূহল ভাঙতে দাঁড়িয়ে যায়। একটা ছেলের দেখা শেষ হলে চম্পাবতী দেখার জন্য চোখ রাখে। চোখ রাখতেই বায়োস্কোপের লোকটি মুখ দিয়ে বলতে শুরু করে, আকার দেখ বাহার দেখ, মজার অবাক ছবি দেখ। চম্পাবতী একের পর একেকটি ছবি দেখছে, হাসছে। মনে মনে বলে দারুণ তো! কখনো পালকি, নৌকা, ট্রলার, বিমান, ঈগল, ময়না, টিয়ে, সাগর, আকাশ, চাঁদ, তারা, ভূত-প্রেত, রাজরানী, আবার ঘন কালো আকাশ, চমকানো বিদ্যুৎ, ঝুপঝুপ বৃষ্টি পড়া। দারুণ খুশি চম্পাবতী। দেখা শেষ হলে বাবা বলে, কেমন লাগল চম্পা, বায়োস্কোপ।
-বাবা, দারুণ, অপূর্ব, মজার। না থেমে আরও বলে, বাবা আমিও পারব ওটা বানাতে। আহামরি কিছুই না।
শুনে বাবা তো অবাক। মনে মনে বলে, চম্পা কী বলে, এত সোজা, পারবে সে! বাবা কথা না বাড়িয়ে বলে, সন্ধ্যা হচ্ছে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো।
-তাই চলো বাবা।
গ্রামের পথ আঁকাবাঁকা, মাটির। বড় রাস্তাগুলো পাকা। ওখানে রিকশা, ট্যাক্সি, গাড়ি, বাস চলে। হাঁটতে হাঁটতে বাবার হাত ধরে বলে, বাবা- ওই বায়োস্কোপটা তৈরি করা অত কঠিন কাজ নয়। তুমি আমাকে একটা বড় বাক্স এনে দেবে। নানা ধরনের ছবি দেবে। তারপর চিকন করে কাগজ জোড়া দিয়ে লম্বা করব এবং তার ওপর পাশাপাশি ছবিগুলো লাগাব।
-তারপর কী করবি? সত্যি সত্যি তুই পারবি তো!
-বাবা, আমি বায়োস্কোপের সব কারুকাজ দেখে নিয়েছি। আমি ঠিকই পারব।
-তারপর কী করবি? বাবা প্রশ্ন করে।
-তারপর! একপাশে একটি লাঠিতে ছবিগুলো প্যাঁচিয়ে নেব। অন্যপাশে আরেকটি লাঠিতে প্যাঁচিয়ে ঘোরাতে থাকব। ব্যস, বায়োস্কোপ তৈরি হয়ে গেল! বাক্সের সামনে দুটো খুপরি করব। তুমি এবং মা দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখবে। আমি আকার দেখ, বাহার দেখ গান করে তোমাদের বায়োস্কোপ দেখাব। কিন্তু আমার সব সরঞ্জাম চাই।
-বাব্বা, চম্পা তোর মাথায় এত বুদ্ধি! তুই আমাকে অবাক করে দিলি। ঠিক আছে মা কাল সকালে বায়োস্কোপ তৈরির সব সরঞ্জাম এনে দেব। তারপর তোর তৈরি করা বায়োস্কোপ আমি তোর মা মজা করে দেখব।
ততক্ষণে ওরা বাড়ির দরজায় পৌঁছে যায়। চারদিকে আঁধার হাতছানি দিয়ে ডাকে।
বাড়িতে ঢোকার মুহূর্তে চম্পাবতী বলে, বাবা মনে রাখবে কাল সকালে বায়োস্কোপ তৈরির সব সরঞ্জাম নিয়ে আসবে।
-মনে থাকবে চম্পা। তুই ভাবিসনে।
মা বলে, চম্পা কী বলছে?
-তোমার মেয়ে মেলায় আজকে বায়োস্কোপ দেখে সেটা বানাবে বলছে। সেটা তৈরি করতে যা লাগবে আনতে বলছে। বাবা উত্তর দেয়।
-ওমা সে কী, সেই তো আনন্দের কথা। আমাদের চম্পা অনেক বড় একটা হবে। ঠিক আছে মা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়।
রাতের ভাত খেয়ে মা-বাবার মাঝখানে চম্পা শুয়ে পড়ে। মা-বাবা ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়। চম্পার চোখে ঘুম নেই। কখন সকাল হবে, বাবা বায়োস্কোপের সরঞ্জাম আনবে, তারপর বায়োস্কোপ তৈরি করবে।
এএডি/