লম্বা নাকের দৈত্য হাতি আর খোকার বন্ধুত্ব

রথিন্দ্রজিৎ হিরু

খোকা পড়ালেখায় ভীষণ অমনোযোগী। বলতে গেলে লেখাপড়া করতে তার একদমই ভালো লাগে না। তার মন পড়ে থাকে অন্যদিকে। খোকার ছবি

2026-01-31T01:29:35+00:00
2026-01-31T01:29:35+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
লম্বা নাকের দৈত্য হাতি আর খোকার বন্ধুত্ব
রথিন্দ্রজিৎ হিরু
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:২৯ এএম 
ফাইল ছবি
খোকা পড়ালেখায় ভীষণ অমনোযোগী। বলতে গেলে লেখাপড়া করতে তার একদমই ভালো লাগে না। তার মন পড়ে থাকে অন্যদিকে। খোকার ছবি আঁকা ভীষণ পছন্দ। তার পড়ার ঘরে ঢুকলে মনে হয় একটি আর্ট স্কুল। তার খাতা থেকে শুরু করে নতুন নতুন বইয়ের মাঝেও ছবি আঁকা। মা তাকে পড়ার জন্য সবসময় বকাঝকা করে। মার এমন বকাঝকা শুনতে শুনতে কান যেন ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। এমন বকাঝকা শুনতে শুনতে খোকা একদিন ঘর থেকে পালিয়ে গেল কাউকে কিছু না বলে।

স্কুল থেকে এসে দুপুরের ভাত খেয়ে খেলতে যাবে বলে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় কিছু রংপেন্সিল আর কাগজ একটি বেগে করে নিয়ে যায়। এখন সে কোথায় যাবে তা কিছুই ঠিক করেনি। গাঁয়ের খেলার মাঠে কিছুক্ষণ বসে খেলা দেখছিল। খেলা দেখতে দেখতে তার মার বকুনির কথা মনে পড়ে যায়। সেখান থেকে উঠে হাঁটতে লাগল আর চিন্তা করতে লাগল মার কথা। তার কিছুদূর যাওয়ার পর বাড়ি ফিরতে চাইলে পড়ার কথা মনে পড়ায় আবার হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। তার গ্রাম ছেড়ে আরেকটি গ্রাম, তার আরও পরে একটি বন, সেই বনে খোকা ঢুকে পড়ে। যেখানে সে কোনোদিন যায়নি।

বনের একদম মাঝখানে চলে যায়, আর সে রাস্তা হারিয়ে ফেলে। সারারাত সে হেঁটেই পার করেছে। সদ্য ভোরের আলো গাছে পাতার ফাঁকে একটু করে ঢুকছে। খোকা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সে একটি গাছের নিচে বসে পড়ে, এমন সময় তার ঘুম চলে আসে। ঘণ্টাখানেক ঘুমানোর পর খোকার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে হঠাৎ সে হতভম্ব হয়ে পড়ে, ভাবতে লাগল আমি কোথায় এলাম। সে বাড়ি ফিরতে চাইলেও আর তা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু কোনো উপায় না পেয়ে রংপেন্সিল বের করে আঁকতে শুরু করে। আঁকতে আঁকতে হঠাৎ চলে আসে একটি ছোট্ট হাতি, যে কি না দলছুট হয়ে হারিয়ে ফেলেছে পরিবার। ছোট্ট হাতিটি খোকার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে একটি গাছের ফাঁকে। খোকা বাচ্চা হাতিকে দেখে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল।

খোকা কোনোদিন হাতি দেখেনি। হাতি দেখেছিল গেমিং কাটুনে, যা লম্বা নাকের সেই দৈত্যর মতো। বাচ্চা হাতিকে দেখে ওই দৈত্য হাতি মনে করে আরও ভয় পেয়ে গেল। বাচ্চা হাতি একটু পর খোকার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে তার শুঁড়টি নাড়তে থাকে আর ডাকতে থাকে। খোকা তার শিশুসুলভ আচরণ দেখে ভয় চলে যায়। খোকা বাচ্চা হাতির পাশে গিয়ে বসে আর জিজ্ঞেস করছে- তুমি কি আমার মতো ঘর পালিয়ে এসেছ?
 
তুমিও কি আমার মতো মার বকুনি সহ্য না করে চলে এসেছ, যেমন আমি ঘর থেকে পালিয়ে এসেছি। মা আমাকে পড়ার জন্য খুব বকাঝকা করত, তাই আমি ঘর থেকে পালিয়ে এসেছি। খোকার এমন মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনে বাচ্চা হাতিটি তার শুঁড় দিয়ে খোকার কাঁধে রাখে, খোকাও নির্ভয়ে বাচ্চা হাতিকে আদর করতে লাগল।

এখন থেকে খোকা আর বাচ্চা হাতি বন্ধু হয়ে গেল। বাচ্চা হাতি আর খোকা খেলতে লাগল। দুপুর হতে হতে খোকার খুব খিদে পায়, বাচ্চা হাতিরও খুব খিদে পায়। বনের মধ্যে কী খাবে তারা। খোকা বাচ্চা হাতিকে জিজ্ঞেস করল- আচ্ছা তোমার কি খিদে পেয়েছে? আমার তো খুব খিদে পেল।

আমরা কী খেতে পারি, এখানে তো আমারও মা নেই তোমারও মা নেই, আমাদের এখন কী হবে, কে খাবার দেবে। এই কথা বলতেই বাচ্চা হাতি খোকাকে নিয়ে ঘুরতে লাগল বনে, কিছুদূর এগিয়ে যেতেই একটি কলাগাছে বেশ কিছু কলা দেখতে পায়, কিছু পাকা কিছু কাঁচা। খোকা চিন্তা করতে লাগল কলাগুলো কীভাবে খাব, আমি তো নিতে পারব না। খোকা বাচ্চা হাতিকে বলল- বন্ধু তুমি কি কলাগাছটি ভাঙতে পারবে? যদি ভাঙতে পার তবে আমরা কলাগুলো নিয়ে খেতে পারব। বাচ্চা হাতিটি কলাগাছের পাশে ঘোরাঘুরি করে তার মাথা দিয়ে ঠেলে কলাগাছটি ভেঙে ফেলে।

খোকা সেখান থেকে কলা ছিঁড়ে নিজেও খাচ্ছে বাচ্চা হাতিকেও দিচ্ছে। এভাবে তাদের বেশ কয়দিন গেল। আরেক দিন বনে একটি ময়ূর দেখতে পায়। ময়ূর পেখম মেলে নাচতে থাকে। খোকা ময়ূরের নাচ দেখে আনন্দে নাচতে থাকে। খোকাকে দেখে বাচ্চা হাতিও নাচতে থাকে। এদিকে খোকাকে খুঁজতে থাকে তার মা-বাবা সবাই। মা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। বাড়ির সবাই খুঁজতে বের হয়। সবাই খোঁজ নিতে থাকে- কোথাও খোকার খোঁজ পাচ্ছে না। খোকার হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সবার মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। খোকাকে যেমন তার মা-বাবা খুঁজছে ঠিক সেভাবে বাচ্চা হাতিকেও তার মা খুঁজছে। বাচ্চা হাতিকে খুঁজে না পেয়ে মা হাতিরা সবাই গ্রামের দিকে চলে আসে। এতে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যায়।

গ্রামের মাঝে হইচই পড়ে যায়। সবাই মিলে মা হাতিদের তাড়াতে লাগল। মা হাতিরা তাদের তাড়ানো দেখে পালিয়ে যেতে যেতে সামনে যা পাচ্ছে তা নষ্ট করে দিচ্ছেÑ ঘর-বাগান কিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। মা হাতিরা ভাবতে লাগল তারা তাদের বাচ্চা হাতিকে বন্দি করে রেখেছে। একদিন বাচ্চা হাতি আর খোকা বনের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে মা হাতিদের সামনে পড়ে যায়। মা হাতিরা তাদের বাচ্চাকে দেখে জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকে।

খোকা একদম ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো। মা হাতিরা খোকাকে দেখে খোকার সামনে চলে আসতে থাকে মারার জন্য। খোকা চোখ বন্ধ করে একটি গাছের ফাঁকে বসে পড়ে। মা হাতির এমন অবস্থা দেখে বাচ্চা হাতিটি মা হাতির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। বোঝাতে লাগল সে কোনো শত্রু নয়, তার বন্ধু। বাচ্চা হাতির আচরণে মা হাতিরা থেমে যায়। বাচ্চা হাতি খোকাকে গাছের ফাঁক থেকে বের করে তাদের সামনে নিয়ে আসে। তারাও খোকাকে বেশ আদর করতে লাগল। হয়তো বাচ্চা হাতি তাদের ভাষায় খোকা আর তার বন্ধুত্বের কথা বলে দিয়েছে, তাই মা হাতিদের রাগ চলে গেল। খোকা এখন তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল। মা হাতিরা খোকাকে তাদের পিঠে চড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

মা হাতিদের বুঝতে বাকি রইল না খোকা হয়তো ভুলে বনে চলে এসেছে। তারা চিন্তা করতে লাগল কীভাবে খোকাকে তার বাড়িতে পৌঁছানো যায়, এটিও ভাবতে লাগল ওই গ্রামের মানুষ তো তাদের আক্রমণ করেছে। আবার যদি যাই তবে আমাদের আবারও আক্রমণ করবে। আর কিছু না ভেবে তারা খোকাকে নিয়ে গ্রামের দিকে যেতে লাগল। বন পেরিয়ে গ্রামের দিকে কিছুদূর যেতেই খোকার পরিবার খোকাকে দেখতে পায়। মা হাতির পিঠে সবাই দেখে অবাক হয়ে রইল। কীভাবে সম্ভব! বনের হাতিরা আমাদের মেরে ফেলার জন্য যেভাবে আক্রমণ করেছিল; কিন্তু খোকাকে না মেরে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছে, বেশ অদ্ভুত তো! মা হাতি খোকাকে তাদের সামনে রেখে বনে চলে যেতে লাগল।

এদিকে খোকাকে পেয়ে তারাও বাড়িতে চলে গেল। খোকার বাড়িতে আর মন বসছে না। বাচ্চা হাতির কথা মনে পড়ে। এদিকে বাচ্চা হাতিরও খোকার কথা মনে পড়ে। বাচ্চা হাতিটি একা একা আসতে পারছে না। মা হাতি তাকে চোখে চোখে রাখছে ঠিক মানুষের মতো। বাচ্চা হাতির ছটফট দেখে বুঝতে পেরে সবাই মিলে আবারও গ্রামে ছুটে গেল খোকার বাড়িতে। গ্রামের মানুষও আর তাদের কোনো আক্রমণ করছে না। বনের হাতি আর গ্রামের মানুষের মাঝে একটি বন্ধন সৃষ্টি হয়। কেউ কাউকে কোনো ক্ষতি করছে না, সবাই ভালোভাবে দিন কাটাতে লাগল। খোকা বড় হতে লাগল, বাচ্চা হাতিও বড় হতে লাগল। একে অপরের প্রতি গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: