আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হচ্ছে লেবার পার্টি। তবে ১১ দলীয় জোটের ঘোষণা দিলেও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ মুহূর্তে আসন সমঝোতায় সমাধান না আসায়, আকস্মিকভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বের হয়ে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না হলে জোটটি ১০ দলের হয়েছিল। তবে, শনিবার (২৪ জানুয়ারি) লেবার পার্টি যুক্ত হলে আবার ১১ দলীয় জোটই হবে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়নে আয়োজিত পথসভায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ দুই নেতার বক্তব্যে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। খোদ বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ড. মুস্তাফিজুর রহমান ইরানও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জোটে যুক্ত হচ্ছে লেবার পার্টি। এমন কথা চাউর হয়েছে। আপনারা কী সত্যিই যাচ্ছেন? এমন প্রশ্নে ড. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘কথাবার্তা চলছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি নিজে নির্বাচনে এবার নেই, তবে আমাদের দলীয় ১৫ জন প্রার্থী এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসন নিয়ে ওইভাবে এখন কিছু করা সম্ভব না। ১০ দলীয় জোটে যাওয়ার কথাবার্তা হচ্ছে। দেখি আপনারা জানতে পারবেন। হয়ত আজকে (গতকাল শুক্রবার) বা কাল জানতে পারবেন।’
ইরান বলেন, ‘আমি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত না, তবে যদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় তাহলে জানাব।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম নেয় ইসলামপন্থি দলগুলোর ঐক্য নিয়ে। বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ৫ আগস্টের পর শীর্ষ নেতারা ইসলামপন্থিদের এক হয়ে নির্বাচন করার কথা বলেন।
২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দলীয় কর্মী সমাবেশের উদ্দেশ্যে বরিশাল সফর করেন। সফরকালে চরমোনাইর পীরের দরবারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আমির সৈয়দ রেজাউল করিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
পরবর্তীতে যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকের ‘ইসলামী দলগুলোর ঐক্য বা জোট হচ্ছে কী না’ প্রশ্নের জবাবে দুই দলের আমির ঐক্যের জন্য জনসাধারণের কাছে দোয়া চান। তারা বলেছিলেন, ইসলামী দলগুলো ভোটকেন্দ্রে একটি বাক্স পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এরপরই জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ আট দল নিয়ে গঠিত জোটের পথচলা শুরু হয়।
জোটের অন্যদলগুলো হলো- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
প্রথমে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক হিসেবে আট দলের ব্যানারে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, নির্বাচনের পূর্বে গণভোট, সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ বাস্তবায়ন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।
পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আসন সমঝোতার স্বার্থে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যোগ দিলে তা ১১ দলীয় জোটে পরিণত হয়। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপোড়েনে শেষমুহূর্তে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বিদায় নেয়।
১১ দলের আসন সমঝোতার জোট হয়ে যায় ‘১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ জোট। যেখানে ইসলামী আন্দোলন ব্যতীত নেতৃত্বের আসনে এখন জামায়াত। তবে, ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর থেকেই নতুন জোট সঙ্গীর কথাবার্তা চলছিল। আবারও ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ জোটে পরিণত হচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন আসন সমঝোতার জোটটি।
শনিবার লেবার পার্টি যুক্ত হলে আবার ১১ দলীয় জোট হবে বলে জানিয়েছেন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমন্বয়ক জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ড. হামিদুর রহমান আযাদ।
গতকাল শুক্রবার কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়নে আয়োজিত পথসভায় হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আজ দুইটি ধারায় বিভক্ত হয়েছে গোটা জাতি। একদিকে বাংলাদেশের ১১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, ১০ দল...। আমি আগাম ঘোষণা দিলাম, কাল আরও একটি দল যুক্ত হবে। সে কারণে আমাদের ১১ দলীয় ঐক্য।
যদিও তিনি তার বক্তৃতায় বলেনি, কোন দলটি যুক্ত হচ্ছে তাদের জোটে। তবে জানা গেছে, মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের লেবার পার্টিই তাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র ছিল লেবার পার্টি। কিন্তু নির্বাচনে প্রত্যাশিত আসন ছাড় না পাওয়ায় আগেই বিএনপির সঙ্গ ছাড়ার কথা জানিয়েছিল দলটি। এবার তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘কথাবার্তা হচ্ছে। ১০ দলীয় জোট বড় হচ্ছে। অন্তত একটা দল তো নিশ্চিত জোটে যুক্ত হচ্ছেন।’
প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। এখন কীভাবে জোট? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন তো বাস্তবিক আসন সমঝোতা সম্ভব হবে না। তবে ভিন্ন কৌশলে সেটা করা সম্ভব। আবার রাজনৈতিক সমঝোতাও হতে পারে। আপনারা অপেক্ষা করেন, ম্যাসেজ পেয়ে যাবেন।’
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই প্রক্রিয়া, মনোনয়নপত্র বাতিল, আপিল ও আপিল নিষ্পত্তি শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ ছিল, সেটি শেষ হয়েছে ২০ জানুয়ারি। পরদিন ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দও দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এরপর গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা। যা চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে গণভোট।
সময়ের আলো/এনএ