ভেঙে পড়ছে বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থা

জার্মান লেখক আর্নস্ট ইয়ুংগারের গা ছমছমে গল্প ‘ভায়োলেট এন্ডাইভস’-এ দেখা যায়, এক ব্যক্তি একটি বিলাসবহুল দোকানে ঢোকে। যেখানে বিক্রেতা একেবারে

2026-01-25T02:19:35+00:00
2026-01-25T02:19:35+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
ভেঙে পড়ছে বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থা
স্বর্ণের দামে ধারাবাহিক উল্লম্ফন
প্রকাশ: রোববার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:১৯ এএম   (ভিজিট : ৩৪১)
ফাইল ছবি
জার্মান লেখক আর্নস্ট ইয়ুংগারের গা ছমছমে গল্প ‘ভায়োলেট এন্ডাইভস’-এ দেখা যায়, এক ব্যক্তি একটি বিলাসবহুল দোকানে ঢোকে। যেখানে বিক্রেতা একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রদর্শিত খাবারগুলোর বর্ণনা দিচ্ছিল। যেগুলো আসলে মানুষের মাংস। সে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেয় কীভাবে সেগুলো রান্না করতে হয়। গল্পটি এমন এক সমাজের প্রতীক, যেখানে ভয়াবহ বিষয়কেও মানুষ প্রায় চোখ না মেলেই মেনে নেয়। তবে এতটা নৃশংস না হলেও গত কয়েক বছরে স্বর্ণের দামের অস্বাভাবিক উত্থানের পরও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়াও প্রায় একই রকম; সবকিছু যেন স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দাম বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বহু মানুষ ইচ্ছা করেই এই অস্বস্তিকর প্রবণতাকে উপেক্ষা করছে। আর চোখে পড়লেও কেন এমন হচ্ছে তা নিয়ে তারা ভাবতে চায় না। আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আসল অনিচ্ছা হলো একটি গভীর তিক্ত বাস্তবতা স্বীকার করায়। আর তা হলো, ডলারের অবমূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক রিজার্ভ ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পুনর্গঠন চলছে। ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থা। আরটিডটকম।

আকাশছোঁয়া দাম : মাত্র এক দশকে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স প্রায় ১ হাজার ডলার থেকে বেড়ে চলতি সপ্তাহে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮০০ ডলারেরও বেশি। শুধু ২০২৫ সালেই দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ; যখন সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল (সাধারণত উচ্চ সুদের হার স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদ থেকে বিনিয়োগকারীদের দূরে সরিয়ে দেয়)। এটি একটি বিশাল  রেড অ্যালার্ট। এটি দেখাচ্ছে বর্তমানে বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার গভীরে কিছু একটা ভেঙে পড়েছে। তবু আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আর্নস্টের গল্পের চরিত্রের মতো এমন ভান করছে যেন প্রদর্শনী কেসে মানুষের মাংস সাজানো নেই, সবকিছুই স্বাভাবিক।

গত ডিসেম্বর জেপি মরগান এক গবেষণা প্রতিবেদনে লিখেছিল, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছুঁতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে ৬ হাজার ডলারও সম্ভব।” ভাষা ছিল বিশ্লেষকসুলভ ও ঠান্ডা, যেন বিষয়টি খুবই সাধারণ। অথচ জানুয়ারি শেষও হয়নি, তার আগেই স্বর্ণ জেপি মরগানের পুরো বছরের পূর্বাভাস প্রায় ছাড়িয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো অনেক কারণ রয়েছে। জাপানের নড়বড়ে বন্ড বাজার, টালমাটাল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সামগ্রিকভাবে মনে হতে থাকা যে বিশ্বকে ধরে রাখা সুতো দ্রুত ছিঁড়ে যাচ্ছে। এটি আসলে বাস্তবের খুব কাছাকাছি। শুধু মনোভাবের কারণে দশ বছরে স্বর্ণের দাম চার গুণ, দুই বছরে দ্বিগুণ হতে পারে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকই আসল চালিকাশক্তি : স্বর্ণের এই উল্লম্ফনের মূল কাঠামোগত কারণ হলো, বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কিনে ভল্টে ভরছে। আগে স্বর্ণবাজার নিয়ন্ত্রণ করত পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা, যারা মূলত সুদের হারের পূর্বাভাস হিসেবে স্বর্ণে বাজি ধরত। এখন দাম নির্ধারণ হচ্ছে ওয়াল স্ট্রিটের বাইরে, কারণ সুদের দিকে না তাকিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নির্বিচারে স্বর্ণ জমাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। পাশাপাশি ভারত, তুরস্ক, ব্রাজিল ও পোল্যান্ডও উল্লেখযোগ্য। লক্ষণীয়, এদের মধ্যে কেবল পোল্যান্ডই পুরোপুরি পশ্চিমা বলয়ে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী এক বছরে বৈশ্বিক স্বর্ণ রিজার্ভ আরও বাড়বে বলে আশা করছে।

স্বর্ণ এখন সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক রিজার্ভ সম্পদ। আর এর বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ডলারকে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট রিজার্ভের প্রায় ৩০ শতাংশই স্বর্ণে রূপ নিয়েছে। বাস্তবে এই হার আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক স্বর্ণ লেনদেনই প্রকাশ করা হয় না। আইএমএফে দেশগুলো যা স্বেচ্ছায় জানায়, সেটিই একমাত্র সরকারি তথ্যের উৎস যার নির্ভরযোগ্যতা দিন দিন প্রশ্নবিদ্ধ।

অনেক সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে সংস্থার মাধ্যমে স্বর্ণ কেনে, যাতে দায় এড়ানো যায়। চীনের ক্ষেত্রেও এমন বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা পিপলস ব্যাংক অব চায়নার সঙ্গে যুক্ত হলেও আইএমএফে কোনো হিসাব দেয় না। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, বর্তমানে সরকারি খাতের মোট স্বর্ণ চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই রিপোর্ট করা হয় না। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনের গোপন স্বর্ণ ক্রয় তাদের ঘোষিত পরিমাণের দশ গুণও হতে পারে। একে বিশ্লেষক ইয়ান নিউইনহুইস বলেন, গোপন ডি-ডলারাইজেশন।

ডলারের বিকল্প নিয়ে চিন্তা : ডলার ব্যবস্থাকে তিনটি বৃত্তে কল্পনা করা যায়। প্রথমটি লেনদেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পেমেন্ট। দ্বিতীয়টি ঋণ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা। তৃতীয়টি রিজার্ভ ও সম্পদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঞ্চয়। প্রথম দুই বৃত্তে তাকালে ডলারের আধিপত্য এখনও অটুট। কিন্তু তৃতীয় বৃত্তেই আসল পরিবর্তন চলছে। এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে বাকি দুই বৃত্তেও ছড়িয়ে পড়বে। ভবিষ্যতে বাণিজ্য সরাসরি স্বর্ণে নিষ্পত্তি হবে না, তবে একটি বেশি বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যেখানে স্বর্ণ হবে নিরপেক্ষ রিজার্ভ সম্পদ। কারণ সহজ ডলার ধরে রাখা এখন লোকসানের ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পাহাড়ের কোনো বাস্তব সমাধান নেই। বাস্তবে তাদের হয় ঋণের বোঝা কমাতে মুদ্রার প্রকৃত মূল্য ক্ষয় করতে হবে, নয়তো উচ্চ সুদের ভারে অর্থনীতি শ্বাসরুদ্ধ হবে। সরকার সাধারণত ধীরে মরাকে বেছে নেয়। ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক আচরণ দেখাচ্ছে, ডলারের অবমূল্যায়ন চলতেই থাকবে।

এর মানে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা ডলার সম্পদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমছে। শুধু মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা নয়, ধীরে ধীরে দেউলিয়া হওয়ার ভয়ও যোগ হচ্ছে। ফলে অনেক দেশ নিজেদের মুদ্রায় গুরুত্বপূর্ণ পণ্য যেমন জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম নির্ধারণ করতে চাইছে। চীন এতে সবচেয়ে এগিয়ে।

ভল্টের ভেতরের হাতি : তবু মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক ধরনের অস্বীকার চলছে। ফেডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভের ৫৮ শতাংশই ডলারে। একই সঙ্গে স্বীকার করেছে, স্বর্ণের অংশ ২০১৫ সালের ১০ শতাংশের নিচ থেকে বেড়ে এখন ২৩ শতাংশের বেশি। কিন্তু ফেডের ব্যাখ্যা এটা নাকি শুধু স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ার ফল! গোপন স্বর্ণ ক্রয়ের কথা নেই। কেন দাম এত বেড়েছে, তা নিয়ে কোনো কৌতূহলও নেই।

ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, চীনে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ছে কারণ দেশটিতে মন্দা চলছে। মানুষ নিজের মুদ্রায় আস্থা পাচ্ছে না। অর্থাৎ স্বর্ণের উত্থান ডলারের দুর্বলতার নয়, চীনের সমস্যার ফল! কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের স্বর্ণ আমদানির বড় অংশই রাষ্ট্রীয় বা আধা-রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যমে হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মাধ্যমে নয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, সত্তরের দশকে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ভেঙে স্বর্ণকে কেন্দ্রীয় অর্থ ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র চাইত স্বর্ণ যেন আর কখনো মূল ব্যবস্থায় না ফেরে। কিন্তু ইতিহাস যেন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ধীরে, নিঃশব্দে, কোনো ঘোষণা ছাড়াই স্বর্ণ আবার বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসছে। এটি কোনো পশ্চিমা পরিকল্পনা নয়, বরং এমন এক কাঠামোগত পরিবর্তন, যা পশ্চিম নিজেই পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।

লেখক : হেনরি জনস্টন। মস্কোভিত্তিক এই লেখক এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্থায়ন-বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করছেন।

Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: