‘ভদ্রলোকের খেলা’ ক্রিকেটে ভারতের একক কর্তৃত্ব

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) নিজেকে বৈশ্বিক ক্রিকেটের নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করলেও কিছু সিদ্ধান্ত ও আচরণ সেই দাবিকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ

2026-01-25T23:03:12+00:00
2026-01-25T23:03:12+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
খেলা
‘ভদ্রলোকের খেলা’ ক্রিকেটে ভারতের একক কর্তৃত্ব
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:০৩ পিএম 
‘ভদ্রলোকের খেলা’ ক্রিকেটে ভারতের একক কর্তৃত্ব। ছবি : সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) নিজেকে বৈশ্বিক ক্রিকেটের নিরপেক্ষ অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করলেও কিছু সিদ্ধান্ত ও আচরণ সেই দাবিকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কাগজে কলমে আইসিসি অভিভাবক হলেও বিশ্ব ক্রিকেট শাসিত হতো তিন মোড়ল ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের অলিখিত চুক্তিতে। কিন্তু গত এক দশকে সেই সমীকরণ আমূল বদলে গিয়েছে। ভদ্রলোকের খেলা খ্যাত ক্রিকেটে এখন চলে ভারতের একক কর্তৃত্ব। 

বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই) যেন কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রীড়া রাজনীতির শক্তিকেন্দ্র। আইসিসির রাজস্ব বণ্টন থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের ভেন্যু বা প্রতিপক্ষের ভিসা- সবকিছুতেই এখন দিল্লির অঙ্গুলিহেলন স্পষ্ট।

বিগ থ্রি থেকে একক মোড়ল : ক্রিকেটে ক্ষমতার মূল উৎস হলো অর্থ, আর সেখানেই ভারত এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৪ সালে যখন এন. শ্রীনিবাসন আইসিসির চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন তিন মোড়ল মিলে রাজস্বের বড় অংশ নিজেদের পকেটে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২৩ সালে ইএসপিএন ক্রিকইনফোর অনুসন্ধানী সাংবাদিক উসমান সামিউদ্দিন ফাঁস করেন, ২০২৪-২০২৭ চক্রের নতুন মডেলে ভারত একাই আইসিসির আয়ের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ বা প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ডলার পাবে। এই চক্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইংল্যান্ড পাবে মাত্র ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়া ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। ক্রিকেট বিশ্লেষক গিডিয়ন হাই একে ‘ক্রিকেটের সাম্যবাদের কফিনে শেষ পেরেক’ বলেছেন। ভারত এই মডেলের মাধ্যমে এমন এক অর্থনৈতিক দেয়াল তুলে দিয়েছে যে, আইসিসির অন্য ১০৪টি দেশ মিলেও ভারতের সমান অর্থ পায় না। এর ফলে, আইসিসির বোর্ডরুমে অন্য কোনো দেশ ভারতের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।


জিও-পলিটিক্যাল অস্ত্র আইপিএল : কেবল টুর্নামেন্ট নয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) বিশ্ব ক্রিকেটের সূচি নিয়ন্ত্রণ করার চাবিকাঠি। আইসিসির ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রামে (এফটিপি) আইপিএলের জন্য আড়াই মাসের একটি 'অঘোষিত' উইন্ডো তৈরি করে নেওয়া হয়েছে, যখন কার্যত পুরো বিশ্বে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ থাকে। শুধু তা-ই নয়, আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো এখন বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। ভারতের আম্বানি, গোয়েঙ্কা বা জিন্দাল গ্রুপের মতো বড় কর্পোরেট হাউসগুলো এখন দক্ষিণ আফ্রিকা (এসএটুয়েন্টি), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (সিপিএল) বা আরব আমিরাতের (আইএলটি-২০) টুর্নামেন্টের বিভিন্ন দলের মালিক। দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড যখন আর্থিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখন ভারতীয় টাকা তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। এর রাজনৈতিক মূল্য হলো- দক্ষিণ আফ্রিকা বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ড এখন ভারতের অনুগত প্রজা। তারা জানে, ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া মানেই নিজেদের ক্রিকেটীয় ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়া।

দাদাগিরি : মাঠের রাজনীতিতে ভারতের দাপটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ২০২৩ সালের এশিয়া কাপ। আয়োজক পাকিস্তান হলেও বিসিসিআই ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি)-এর প্রধান জয় শাহ সাফ জানিয়ে দেন, ভারত পাকিস্তানে যাবে না। পাকিস্তান বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত লাভ হয়নি। ভারতের চাপে পাকিস্তান ‌‘হাইব্রিড মডেল’ মেনে নিতে বাধ্য হয়, যেখানে ভারত সব ম্যাচ খেলে শ্রীলঙ্কায়। একই নাটকের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিটেও। আইসিসির সূচি অনুযায়ী পাকিস্তানে টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা থাকলেও, ভারত সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। আবারও সেই হাইব্রিড মডেল চাপিয়ে দেওয়া হয়। আইসিসি জানে, ভারত ছাড়া স্পন্সর থাকবে না, তাই তারাও নীরব দর্শকের ভূমিকায়।


ভিসা : ভারত এখন ভিসা ব্যবস্থাকেও প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে ঘায়েল করার অস্ত্র বানিয়েছে। ইংল্যান্ডের শোয়েব বশির বা অস্ট্রেলিয়ার উসমান খাজা- তারা পশ্চিমা দেশের নাগরিক হয়েও শুধুমাত্র পাকিস্তানি বা মুসলিম বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে ভারতীয় ভিসা পেতে চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন। শোয়েব বশিরকে ভিসা জটিলতায় হায়দ্রাবাদ টেস্ট মিস করতে হয়েছিল, যা ব্রিটিশ সরকারের পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলকে হায়দ্রাবাদে পৌঁছানোর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে ভিসা দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তাদের প্রস্তুতি ক্যাম্প বাতিল করতে হয়। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানি দর্শক ও সাংবাদিকদের ভিসা না দিয়ে আহমেদাবাদের গ্যালারিতে একপাক্ষিক সমর্থনের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।

রাজনীতিকীকরণ : ভারতের এই আধিপত্যের কেন্দ্রে এখন রাজনীতি ও ক্রিকেটের একাকার হয়ে যাওয়া। বিসিসিআই সচিব এবং আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র। ক্রিকেটীয় ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলেও কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে তিনি এখন বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসনে। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয়েছে ‘নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম’। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতে, ভারত এখন ক্রিকেটকে তাদের ‘সফট পাওয়ার’ এবং জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। পাকিস্তানের সাথে খেলতে না যাওয়া বা ভেন্যু নিয়ে জটিলতা তৈরি করা—এসবই মূলত ভারতের ঘরোয়া রাজনীতির প্রতিফলন, যেখানে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করে রাখাটা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক কৌশল।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল  আইসিসি  ক্রিকেট  ভারত  কর্তৃত্ব 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: