দলবদলের শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজকে দলে ভেড়ানোর মধ্য দিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির গ্রীষ্মকালীন দলবদলের চিত্রটা যেন পূর্ণতা পেয়েছে। চেলসি থেকে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারকে দলে টেনেছে সিটি, যা প্রিমিয়ার লিগ ও ব্রিটিশ ফুটবলের যৌথ সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফির রেকর্ড।
এনজোকে দলে নিতে চেলসি চেয়েছিল ১৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড। শুরুতে সেই অঙ্কে রাজি ছিল না সিটি। কিন্তু ১ সেপ্টেম্বর দলবদলের শেষ দিনের আলোচনায় পরিস্থিতি বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডেই এনজোকে দলে পায় তারা।
এ নিয়ে চলতি গ্রীষ্মে খেলোয়াড় কেনাবেচায় সিটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে শুধু মাঝমাঠ পুনর্গঠনেই খরচ হয়েছে ৩২৬ মিলিয়ন পাউন্ড। ফলে দলবদলের বাজার বন্ধ হওয়ার পর ইতিহাদে স্বস্তির আবহ থাকাটাই স্বাভাবিক।
বদলে গেছে মাঝমাঠ
বার্নার্দো সিলভা চুক্তির মেয়াদ শেষে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়ার পর মাঝমাঠে বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল সিটির। তার জায়গা পূরণে প্রথম পছন্দ ছিলেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন। ১১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে নিউক্যাসল থেকে তাকে দলে নেয় সিটি। অ্যান্ডারসনকে পাওয়ার দৌড়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে তাঁকে দলে টানায় বাড়তি তৃপ্তিও পেয়েছে সিটি।
এরপর ৮৫ মিলিয়ন পাউন্ডে দলে আনা হয়েছে আয়ুব বুয়াদ্দিকে। মাত্র ১৮ বছর বয়সী মরক্কোর এই মিডফিল্ডারকে ভবিষ্যতের বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফুটবলের পাশাপাশি গণিতে ডিগ্রি করছেন বুয়াদ্দি। তার বুদ্ধিদীপ্ত খেলার ধরনও মুগ্ধ করেছে সিটিকে।
বর্তমান স্কোয়াডে বিশেষজ্ঞ ‘নম্বর ৬’ হিসেবে বুয়াদ্দিকেই দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে অ্যান্ডারসন ও এনজোকে ‘নম্বর ৮’ পজিশনের জন্য ভাবা হচ্ছে। এই দুই খেলোয়াড়ের পেছনেই সিটির খরচ প্রায় ১৯১ মিলিয়ন পাউন্ড।
এনজোকে চাওয়ার পেছনে কোচ এনজো মারেস্কারও বড় ভূমিকা ছিল। চেলসিতে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারের সামর্থ্য সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল মারেস্কার। যদিও ক্লাবের পছন্দের তালিকায় অ্যান্ডারসন এগিয়ে ছিলেন, কোচের আগ্রহে শেষ পর্যন্ত এনজোও সিটির পরিকল্পনায় জায়গা করে নেন।
তবে মাঝমাঠে নতুনদের পাশাপাশি নিকো ও’রাইলিকে আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে সিটির।
শুধু মাঝমাঠেই নয়, বদলেছে পুরো স্কোয়াড
সিটির পুনর্গঠন অবশ্য মাঝমাঠে থেমে নেই। গত শীতের দলবদলকেও এবারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্ক গেয়ি ও অঁতোয়ান সেমেনিওকে আগেই দলে আনার সিদ্ধান্ত ছিল সেই পরিকল্পনারই অংশ।
উইংয়েও এসেছে পরিবর্তন। অস্কার বব জানুয়ারিতে চলে যাওয়ার পর স্যাভিনিও ও ওমর মারমুশও বিদায় নিয়েছেন। তাদের জায়গায় দলে এসেছেন অ্যালান এলিয়াস ও ইলিমান দিয়েং। তবে আক্রমণে সেমেনিওর ভূমিকা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
মারমুশকে মূলত এরলিং হলান্ডের বিকল্প হিসেবে দেখা হলেও হলান্ড মাঠের বাইরে থাকলে সেন্টার-ফরোয়ার্ড হিসেবে সবচেয়ে বেশি সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা এখন সেমেনিওর। এভারটনের হয়ে সিটির বিপক্ষে তাঁর পারফরম্যান্সও ক্লাব কর্মকর্তাদের নজর কেড়েছিল।
রক্ষণেও ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে পরিবর্তন এনেছে সিটি। জন স্টোনস ফ্রি ট্রান্সফারে চলে যাওয়ায় তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে মার্ক গেয়িকে দেখা হচ্ছে। নাথান আকের জায়গায় প্রস্তুত করা হচ্ছে ভিতর রেইসকে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সিটিতে যোগ দেওয়া ২০ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান গত মৌসুমে ধারে জিরোনায় খেলেছেন। এবার মূল স্কোয়াডে নিয়মিত দেখা যেতে পারে তাঁকে।
স্যাভিনিওকে বিক্রিতেও বড় সাফল্য
দলবদলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল স্যাভিনিওকে টটেনহামে বিক্রি। প্রাথমিকভাবে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডে তাকে বিক্রি করেছে সিটি। চুক্তিতে আরও ৫ মিলিয়ন পাউন্ডের নিশ্চিত অ্যাড-অন এবং অতিরিক্ত ৫ মিলিয়ন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রেইন্ডার্স ও গনসালেসকে দলে আনতে যে অর্থ খরচ হয়েছিল, স্যাভিনিওর বিক্রি থেকে তার বড় অংশ পুনরুদ্ধার করেছে সিটি। মারমুশের ক্ষেত্রেও তাঁর ধারের চুক্তি স্থায়ী হলে খরচের অর্থ উঠে আসবে।
স্যাভিনিওর ক্ষেত্রে অবশ্য লাভের সম্ভাবনা আরও বেশি। গত অক্টোবরে তাকে নতুন পাঁচ বছরের চুক্তিতে রেখে তাঁর বাজারমূল্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল সিটি। টটেনহামের বড় অঙ্কের আগ্রহ সেই মূল্যায়নকেই বাস্তবে পরিণত করেছে।
বদলেছে নেতৃত্বও
শুধু খেলোয়াড় নয়, সিটির নেতৃত্ব কাঠামোতেও এসেছে পরিবর্তন। পেপ গার্দিওলার পর কোচের দায়িত্বে এসেছেন এনজো মারেস্কা। একই সময়ে দীর্ঘদিনের ফুটবল পরিচালক টিক্সি বেগিরিস্তাইনের জায়গায় দায়িত্ব নিয়েছেন হুগো ভিয়ানা।
গার্দিওলা ও বেগিরিস্তাইনের দীর্ঘ সময়ে সিটি অবশ্য সবসময় ট্রান্সফার বাজারের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল না। এবার সেই চিত্রও বদলে গেছে। প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে খেলোয়াড় কিনলেও বিক্রি থেকে তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ পুনরুদ্ধার করেছে ক্লাবটি। ফলে নিট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৩ মিলিয়ন পাউন্ডে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে স্কোয়াডের বয়সে। রদ্রি, বার্নার্দো সিলভা, জন স্টোনস ও আকের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি ২৮ বছর বয়সী রেইন্ডার্সও চলে গেছেন। ২৭ বছর বয়সী মারমুশও আর নেই স্কোয়াডে।
তাদের জায়গায় এসেছে একঝাঁক তরুণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়। ফলে সিটির এবারের দলবদল শুধু খেলোয়াড় কেনাবেচার হিসাব নয়, বরং একটি যুগের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
ইতিহাদের নতুন সিটির বিশ্বাস, এত বড় অঙ্কের দলবদল আগামী গ্রীষ্মে আর প্রয়োজন হবে না। এখন নতুন খেলোয়াড়দের সঙ্গে দলকে গুছিয়ে মাঠে সাফল্য এনে দেওয়াই হবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সময়ের আলো/টিকে