প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:১৮ এএম (ভিজিট : ১৬২)
লন্ডনের গাইস অ্যান্ড সেন্ট থমাস হাসপাতালে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় এআই এবং রোবট প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। ছবি : ডেইলি মিরর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, এআই শ্রমবাজারে সুনামির মতো আঘাত হানছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যাংক জেপি মরগ্যান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডাইমন জানিয়েছেন, অদূর ভবিষ্যতে ব্যাংকটির কম কর্মীর প্রয়োজন হবে। আর এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের প্রধান ডারিও আমোদেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তার কোম্পানির তৈরি প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ‘প্রবেশপর্যায়ের’ সাদা-কলার চাকরির প্রায় অর্ধেকই বিলুপ্ত করে দিতে পারে।
সাদা-কলার চাকরি বলতে মূলত অফিসভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রশাসনিক কাজ বোঝায় যেখানে শারীরিক শ্রমের চেয়ে জ্ঞান, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ব্যাংকার, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইটি বিশেষজ্ঞ, হিসাবরক্ষক কিংবা ব্যবস্থাপকরা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত এই পেশাগুলোতে তুলনামূলক ভালো বেতন ও সামাজিক মর্যাদা থাকে। নিশ্চয়ই এআই এই কর্মীবাহিনীতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। তবে পুরো চাকরি বিলুপ্ত করে দেওয়ার চেয়ে বেশি সম্ভাবনা আছে যে, এই কাজগুলো নতুনভাবে রূপ নেবে। ভবিষ্যতের অফিস রোবটনির্ভর হবে না; বরং মানুষের বুদ্ধি ও কম্পিউটারের ক্ষমতার মিশেলে তৈরি এক ধরনের ‘সাইবর্গ’ কাঠামো গড়ে উঠবে। এই প্রবণতা বোঝার জন্য গত তিন বছরে শ্রমবাজারের পরিবর্তন, অতীতের প্রযুক্তিগত বিপ্লব এবং সেগুলোর ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
সব আতঙ্কের মধ্যেও বাস্তবচিত্র এখনও ভিন্ন কথা বলছে। ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০ লাখ নতুন সাদা-কলার চাকরি তৈরি হয়েছে। যার বড় অংশ ব্যবস্থাপনা, পেশাদার সেবা, বিক্রয় ও অফিসকেন্দ্রিক কাজ। একই সময়ে ব্লু-কলার চাকরির সংখ্যা প্রায় স্থির রয়েছে। এমনকি যেসব পেশাকে এআইয়ের প্রথম শিকার বলা হচ্ছিল, সেগুলোর অনেকটিতেই বরং দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সফটওয়্যার ডেভেলপারের সংখ্যা বেড়েছে ৭ শতাংশ, রেডিওলজিস্ট ১০ শতাংশ এবং প্যারালিগাল ২১ শতাংশ। কিছু প্রবেশপর্যায়ের চাকরিতে নিয়োগ কমলেও তা শুরু হয়েছিল চ্যাটজিপিটি আসার আগেই। ফলে এর পেছনে এআইয়ের চেয়ে বেশি দায়ী উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। বেতনের দিক থেকেও সাদা-কলার কর্মীরা এখনও শক্ত অবস্থানে। ২০২২ সালের শেষ থেকে পেশাদার ও ব্যবসাসংক্রান্ত খাতে প্রকৃত আয় বেড়েছে ৫ শতাংশ, আর অফিস ও প্রশাসনিক কর্মীদের আয় বেড়েছে ১৭ শতাংশ।
সব সামাজিক বৈশিষ্ট্য সমন্বয় করে দেখা গেলে, বর্তমানে সাদা-কলার কর্মীরা ব্লু-কলার কর্মীদের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি আয় করেন। আশির দশকে এই ব্যবধান ছিল অনেক কম। প্রযুক্তির ইতিহাস দেখলেও আতঙ্কের কারণ খুব বেশি নেই। আশির দশকে কম্পিউটার আসার সময়ও ব্যাপক কর্মচ্যুতির আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কম্পিউটার পুরো চাকরি কেড়ে নেয়নি; বরং নিয়মভিত্তিক কাজ স্বয়ংক্রিয় করে মানুষের সময় বাঁচিয়েছে এবং বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তমূলক কাজে মানুষকে আরও কার্যকর করেছে। ফলে অফিসকর্মীদের সংখ্যা ও বেতন-দুটোই বেড়েছে।
এর পাশাপাশি, প্রযুক্তি নতুন পেশাও তৈরি করেছে। ই-কমার্স এনেছে লজিস্টিকস ও ডিজিটাল পেমেন্ট বিশেষজ্ঞ। স্মার্টফোন তৈরি করেছে অ্যাপ ডেভেলপার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করেছে ডিজিটাল মার্কেটার ও ইনফ্লুয়েন্সার। এমআইটির গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেক এসেছে সম্পূর্ণ নতুন পেশা সৃষ্টির মাধ্যমে।
এআই অবশ্য আগের প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু এর মধ্যেও সীমাবদ্ধতা আছে। গবেষকরা একে বলেন, ‘খাঁজকাটা বুদ্ধিমত্তা’- কিছু কাজে এআই খুব ভালো, আবার কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্বল। অ্যানথ্রপিকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ৪ শতাংশ পেশায় এআই তিন-চতুর্থাংশ কাজ করতে পারে। কোনো পেশাই পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়নি।
সাম্প্রতিক শ্রমবাজারের তথ্যও একই ইঙ্গিত দেয়। ২০২২ সালের পর থেকে বড় সাদা-কলার পেশাগুলোতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪ শতাংশ এবং প্রকৃত বেতন ৩ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে যেসব পেশায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে তদারকি ও সমন্বয়ের কাজ আছে- যেমন প্রকল্প ব্যবস্থাপক, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। অন্যদিকে, নিয়মভিত্তিক ব্যাক-অফিস কাজ কমেছে-যেমন বীমা দাবি প্রক্রিয়াকরণ বা প্রশাসনিক সহকারী।
একইসঙ্গে এআই নতুন চাকরিও তৈরি করছে ডেটা অ্যানোটেটর, এআই ইঞ্জিনিয়ার, এআই পরামর্শক, এমনকি ‘চিফ এআই অফিসার’। অনেক নতুন পেশার নামই এখনও স্থির হয়নি। তবে ঝুঁকি একেবারে নেই, এমনও নয়। যেসব কাজে ব্যতিক্রম কম এবং সিদ্ধান্তের গভীরতা নেই, সেগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে। প্রবেশপর্যায়ের চাকরি ও কেরানিভিত্তিক পেশাগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। এই কর্মীদের অভিযোজন ক্ষমতা তুলনামূলক কম, তাই তাদের জন্য পরিবর্তনটা সবচেয়ে কঠিন।
তবু সামগ্রিকভাবে এটি কোনো সর্বগ্রাসী ধ্বংস নয়। আপাতত মানুষের বিচার-বিবেচনা ও যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ই সবচেয়ে বেশি মূল্য তৈরি করছে। বাজারে মানবিক দায়বদ্ধতা, সৃজনশীলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব থেকেই যাবে। এআই সাদা-কলার কাজ বদলে দেবে কিন্তু সেগুলো মুছে দেবে না। ইতিহাস বলছে, অফিসকর্মীরা আগেও বদলেছে, আবার বদলাবে। তবে তারা হারিয়ে যাবে না, শুধু নতুন রূপে হাজির হবে।
সময়ের আলো/এনএ