শরীরে হঠাৎ অস্বাভাবিক ক্লান্তি, অকারণে ওজন বেড়ে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়া বা মনমেজাজের অস্বাভাবিক পরিবর্তন—এমন সমস্যাগুলোকে আমরা অনেক সময় আলাদা আলাদা বিষয় ভেবে গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এসব উপসর্গের পেছনেই লুকিয়ে থাকতে পারে থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা।
গলার সামনের দিকে অবস্থিত ছোট্ট এই গ্রন্থিটি আমাদের শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, হৃদস্পন্দন, হরমোনের ভারসাম্য এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই থাইরয়েডের কার্যকারিতায় সামান্য গরমিল হলেও তার প্রভাব পড়ে পুরো শরীরজুড়েই।
বর্তমানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাপনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং হরমোনজনিত কারণেই এই সমস্যার প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে।
থাইরয়েড কীভাবে সমস্যা তৈরি করে
থাইরয়েড হলো একটি হরমোন উৎপাদনকারী গ্রন্থি, যা মূলত থাইরক্সিন (T4) ও ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T3) নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাকহার নিয়ন্ত্রণ করে।
থাইরয়েড সাধারণত দুই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে—
হাইপোথাইরয়েডিজম : যখন গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে
হাইপারথাইরয়েডিজম : যখন অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ হয়
থাইরয়েড সমস্যার সাধারণ উপসর্গ
থাইরয়েডের সমস্যায় উপসর্গ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে যে লক্ষণগুলো বেশি দেখা যায়, সেগুলো হলো—অতিরিক্ত চুল পড়ে যাওয়া, অকারণে ওজন বেড়ে যাওয়া, সব সময় ক্লান্ত লাগা, ঠান্ডা সহ্য না হওয়া, হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়া, নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক অনিয়ম। এ ধরনের উপসর্গ দীর্ঘদিন অবহেলা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব
থাইরয়েডের স্থায়ী চিকিৎসা কী হবে, তা নির্ভর করে রোগের ধরন ও মাত্রার ওপর। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
যেসব খাবার থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
নারকেল
থাইরয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নারকেল উপকারী বলে মনে করা হয়। নারকেল তেলে থাকা মিডিয়াম চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড ও মিডিয়াম চেইন ট্রাইগ্লিসারাইড শরীরের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। রান্নায় নারকেল তেল ব্যবহার বা পরিমিত পরিমাণে কাঁচা নারকেল খাওয়া উপকারী হতে পারে।
আমলকি
আমলকিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক। থাইরয়েড সমস্যায় নিয়মিত আমলকি খেলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
কুমড়ার বীজ
কুমড়ার বীজে প্রচুর পরিমাণে জিঙ্ক রয়েছে, যা হরমোন নিঃসরণ ও ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন অল্প পরিমাণ কুমড়ার বীজ খাদ্যতালিকায় রাখা থাইরয়েড রোগীদের জন্য উপকারী।
ব্রাজিল নাট
সেলেনিয়াম থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। ব্রাজিল নাটে সেলেনিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে। প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি ব্রাজিল নাট শরীরের সেলেনিয়ামের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে।
যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন
নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা যাবে না
অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণ এড়িয়ে চলতে হবে
নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও মানসিক চাপ কমানো গুরুত্বপূর্ণ
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও এগুলো কখনোই চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। তাই থাইরয়েডের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
/ইউএমএইচ