দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সব বাহিনীর মধ্যে ডিজিটাল ও ফিজিক্যাল সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে এ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। সরকার ও আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে এই নির্বাচনের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বৃহৎ নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেশ কয়েক দিক থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তাব্যবস্থা অন্য যেকোনো সময়ের নির্বাচনের তুলনায় ব্যতিক্রম। এবারই প্রথম লক্ষাধিক সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করছেন কোনো জাতীয় নির্বাচনে। প্রথমবারে মতো কোনো জাতীয় নির্বাচনের জন্য সব বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ।
প্রায় সব কেন্দ্রে এবারই প্রথমবারের মতো থাকছে সিসি ক্যামেরা। সে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে থাকছে বডি ওর্ন ক্যামেরা। এবারই প্রথম নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘সুরক্ষা’ নামে বিশেষ অ্যাপ। সে সঙ্গে ডগ স্কোয়াড, হেলিকপ্টার, বোম্ব বিসপজাল ইউনিট, র্যাপিড অ্যাকশন টিম (র্যাট) ও কুইক রেসপন্স টিমের মতো বিশেষায়িত বেশ কয়েকটি টিম থাকছে নির্বাচনি মাঠে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফেরাতেই এতসব কিছুর আয়োজন, যাতে ভোটাররা নিশ্চিন্তে-নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৫০০ জন এবং দেশের ৫টি জেলার ১৭টি আসনে নৌবাহিনীর ৫ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) থেকে ১ হাজার ২১০ প্লাটুন অর্থাৎ ৩৭ হাজার ৪৫৩ সদস্য মোতায়েন থাকবে। কোস্ট গার্ড দেশের ১০টি জেলার ১৭টি আসনে, ২০টি উপজেলার ৬৯টি ইউনিয়নের ৩৩২টি ভোটকেন্দ্রে ৩ হাজার ৫৮৫ সদস্য মোতায়েন করবে।
পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। র্যাবের মোতায়েন থাকবে ৯ হাজার ৩৪৯ জন সদস্য। এ ছাড়া নির্বাচনে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার সদস্য দায়িত্বে থাকবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) থেকে মোট ১ হাজার ৯২২ জন সদস্য মোতায়েন করা হবে।
তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা : পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সারা দেশে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন ৯৩ হাজার ৩৯১ জন। বাকি সদস্যরা মোবাইল এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবেন।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স, এর বাইরে থাকবে মোবাইল টিম এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্ট্রাইকিং ফোর্স।
নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশের পক্ষ থেকে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা পুলিশ সুপাররা ড্রোন ক্যামেরার সহায়তা নেবেন।
লক্ষাধিক সেনাসদস্য : দেশে এবারই প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচনে লক্ষাধিক সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আগের নির্বাচনে যেখানে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪২ হাজার সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দূরবর্তী এলাকায় অবস্থান করতেন, সেখানে এবার প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত টহলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেনাসদস্যদের।
সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, জাতীয় নির্বাচনে নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সারা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলায় ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
ঢাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার ভোট উপলক্ষে সাধারণ নিরাপত্তার পাশাপাশি সোয়াট ও কে-নাইন ইউনিটসহ পুলিশের বিশেষায়িত সব ইউনিটকে মাঠে নামানো হচ্ছে।
বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তিনি বলেন, ঢাকায় ডিএমপির ২৬ হাজার ৫১৫ জন সদস্য নির্বাচনের বিভিন্ন দায়িত্বে মোতায়েন থাকবেন। ভোটকেন্দ্রের ভেতরের নিরাপত্তার পাশাপাশি বাইরে থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স, মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্স। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠে থাকবে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াট, কে-নাইন ইউনিট ও ক্রাইম সিন ভ্যান।
র্যাবের ৭০০ টহল দল : র্যাবের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহিদুর রহমান বুধবার রাজধানীতে এক প্রেস কনফারেন্সে জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী র্যাব ফোর্সেস গত ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সব নির্বাচনি এলাকায় দায়িত্ব পালন করবে।
সারা দেশে র্যাবের সর্বমোট প্রায় ৭০০টি টহল দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য র্যাবের প্রতিটি ব্যাটালিয়ন ও ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় সংখ্যক টহল দল স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ও র্যাব সদর দফতরে ৩০টি টহল দল সেন্ট্রাল রিজার্ভ হিসেবে প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি র্যাব ডগ স্কোয়াড ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও কক্সবাজারে এবং র্যাব ফোর্সেস সদর দফতরের বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ৭টি জোনে বিভক্ত হয়ে মোতায়েনের জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুত আছে। এ ছাড়া প্রতিটি নির্বাচনি আসনে সাদা পোশাকে র্যাবের গোয়েন্দা সদস্যরা তথ্য সংগ্রহে তৎপর রয়েছেন। দেশব্যাপী বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশির মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।
‘সুরক্ষা’ অ্যাপস ব্যবহার করবেন আনসার সদস্যরা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ৫ লাখ ৬০ হাজার আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন থাকবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘সুরক্ষা’ অ্যাপসের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আনসারের ২ থেকে ৩ সদস্যকে অ্যাপসে রেজিস্ট্রেশন করবেন। নির্বাচনের দিন কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির তথ্য সুরক্ষা অ্যাপসে জানানো হলে মোবাইল ট্র্যাকিং ফোর্স দ্রুত সেখানে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বিজিবি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সারা দেশে ৩৭ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতে বিজিবি নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনেই বিজিবি সদস্যরা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকবেন।
প্রতিটি উপজেলায় গড়ে দুই থেকে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া নির্বাচনের পুরোটা সময় দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি চলবে।
শুধু ঢাকা সেক্টরের অধীনেই ৪২টি অস্থায়ী বেজ ক্যাম্পের মাধ্যমে ৯টি জেলা ও ৪টি সিটি করপোরেশনের ৫১টি নির্বাচনি এলাকায় মোট ১৩৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হচ্ছে। ঢাকা ব্যাটালিয়ন (৫ ও ২৬ বিজিবি), নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৬২ বিজিবি) এবং গাজীপুর ব্যাটালিয়ন (৬৩ বিজিবি) এই দায়িত্ব পালন করবে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির র্যাপিড অ্যাকশন টিম (জঅঞ), কুইক রেসপন্স ফোর্স (ছজঋ) এবং হেলিকপ্টার ইউনিট সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত আছে। এ ছাড়া বিশেষ তল্লাশি অভিযান ও নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষজ্ঞ ‘কে-নাইন’ (কে-৯) ডগ স্কোয়াডও নিয়োজিত আছে।
বিজিবি ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম আবুল এহসান বলেন, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বিজিবি। সংস্থাটি সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
তিনি আরও বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে।
এফআর