গণভোটে গণরায় নতুন দিগন্ত

সাব্বির আহমেদ

জাতীয়

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এদিন আলাদা ব্যালটে গণভোটে ভোট

2026-02-13T05:36:34+00:00
2026-02-13T05:36:34+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
গণভোটে গণরায় নতুন দিগন্ত
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৩৬ এএম   (ভিজিট : ১৭১)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এদিন আলাদা ব্যালটে গণভোটে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে খুব অল্প করে মাত্র চারটি বিষয় লেখা ছিল। এই সনদ বাস্তবায়নে ভোটারদের সমর্থন আছে কি না, সেই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেন ভোটাররা। 

তবে ঢাকা ও তার বাইরে বেশিরভাগ জায়গার ভোটাররা গণভোটে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়া তরুণ প্রজন্ম বেশ উৎসাহ নিয়ে গণভোটের রায় দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে বেশ কয়েক সপ্তাহ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশে গণভোট নিয়ে প্রচার শুরু হয়। প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু গণভোট নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে প্রচার শুরু হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য সেই অবস্থা থেকে সরে এসে সরাসরি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার শুরু করে। কয়েক দিন আগে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ নিয়ে রেডিও টেলিভিশনে প্রচারের জন্য একটি ভিডিও বার্তাও দেন। যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।

ঢাকা-১৮ আসনে বাংলাদেশ হাউজবিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে কথা হয় একজন তরুণ ভোটারের সঙ্গে। 

ডা. রিফাত ফারজনা প্রথমবারের মতো ভোট দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ। তারা রাষ্ট্র সংস্কারে গণভোটের আয়োজন করেছে। জুলাইয়ে স্পিরিট ধরে রাখতে অবশ্যই আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় চাই। তবে সরকারের আরও কিছু সময় নিয়ে প্রচার করা উচিত ছিল। তা হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ কিংবা সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে আরও সচেতন হতো। 

তিনি বলেন, তবুও সবাই এবার ভোটের সঙ্গে গণভোটেও উৎসাহিত হয়েছে। কারণ দেশ গঠনে এর বিকল্প নেই। শুধু সরকারের ওপর দায় দিলে হবে না, নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে গণভোট নিয়ে।

গণভোট দিতে তার কেন্দ্রে ভোটারদের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানান উত্তরা হাই স্কুল কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন। 

তিনি বলেন, যারা ভোট দিতে সমস্যাবোধ করেছেন তাদের নির্বাচন কর্মকর্তারা সহায়তা করেছেন। যারা খুবই বয়োজ্যেষ্ঠ তারা একটু বেগ পেয়েছেন।

রাজধানীর ঢাকা লাগোয়া গাজীপুরের কাপাসিয়ার একটি কেন্দ্র দেওনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমার কেন্দ্রে গ্রামের নারী ভোটারদের একটু বুঝতে অসুবিধা হয়েছে। কারণ এর আগে তারা গণভোট দিয়ে অভ্যস্ত নন। তবে বেশিরভাগ ভোটার স্বাভাবিকভাবেই ভোট দিতে পেরেছেন। অনেক তরুণকে গণভোট দিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করতে দেখেছি।    

ঢাকা জেলার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম বলেন, গণভোট নিয়ে বড় কোনো ঝামেলা হয়নি। তবে গ্রামের অনেক বৃদ্ধ ভোটার বিষয়টি বুঝতে পারেনি বলেই মনে হয়েছে।

ঢাকার অনেক কেন্দ্রেই গণভোট দেওয়ার সময় বিড়ম্বনায় পড়তে দেখা গেছে ভোটারদের। বিশেষ করে অল্প শিক্ষিত এবং বয়স্ক ভোটাররা বেশি সমস্যায় পড়েছেন। এ ক্ষেত্রে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’তে নাকি ‘না’তে ভোট দেবেন— সেটি নিয়েও অনেককে দ্বিধায় পড়তে দেখা গেছে। অনেকেই পোলিং অফিসারদের কাছে জানতে চাচ্ছেন আমি কীসে ভোট দেব। পোলিং অফিসাররা তখন ভোটারকে বলেন, আপনি ভোট কোথায় দেবেন— সেটি আমরা বলে দিতে পারি না।

এ রকম পরিস্থিতি দেখা যায়, ঢাকা-১৫ আসনের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলার ৪ নম্বর বুথে। এখানে ৫০ বছর বয়সি জিয়াদুল ইসলাম এসেছিলেন ভোট দিতে। পোলিং অফিসারের কাছ থেকে ব্যালট পেপার দুটি নেওয়ার পর পোলিং অফিসারের কাছে জানতে চান আমি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব নাকি ‘না’ দেব। আমি তো বেশি লেখাপড়া জানি না, এখানে যেসব বিষয় আছে সেগুলোও পড়তে জানি না। আমি কোথায় ভোট দেব, বুঝতে পারছি না। 

পোলিং অফিসার আসমা বেগম বলেন, আমি তো আপনাকে বলতে পারি না কোথায় ভোট দেবেন। আপনার যেখানে মন চায় আপনি সেখানে ভোট দেবেন। শুধু তাই নয়, ব্যালট পেপার কীভাবে ভাঁজ করবেন, সেটিও ঠিকমতো বুঝতে পারছিলেন না জিয়াদুর। পোলিং অফিসার ব্যালট পেপার ভাঁজ করা শিখিয়ে দিলে তিনি গোপন স্থানে গিয়ে সিল মেরে আসেন।

ভোট দেওয়া শেষে জিয়াদুল ইসলাম বলেন, আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না গণভোটে কোথায় সিল দেব। মূল ভোটে আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম কোন মার্কায় ভোট দেব কিন্তু আমি গণভোট নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। কারণ এর বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার কাছে ধারণা স্পষ্ট না। আরেকটি কারণ হচ্ছে আমি এর আগে কখনো গণভোট দিইনি। তবে শেষ পর্যন্ত আমি দুটি ভোটই ঠিকমতো দিয়েছি।

এই কেন্দ্রের মতো মিরপুর-১৪ আসনের আহমদাবাদ মাদরাসা কেন্দ্রে ভোট প্রদানে অনেক সময় লেগেছে। এখানে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। বুথে দেখা যায়, ভেতরেও অনেক ভোটার দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এই বুথের পোলিং অফিসার আরিফ বিল্লাহার কাছে ভোট প্রদানে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুটি কারণে দেরি হচ্ছে। একটি কারণ এখানে যতসংখ্যক ভোটার তত গোপন কক্ষ নেই। মাত্র একটি গোপনকক্ষ করা হয়েছে। এ কারণে দেরি হচ্ছে। আরেকটি কারণ গণভোট দিতে গিয়েও অনেকে সময় বেশি নিচ্ছেন, প্রশ্নগুলো পড়ে তারপর অনেকেই ভোট দিচ্ছে। এসব কারণে ভোট প্রদানে দেরি হচ্ছে।

অন্যদিকে গণভোটের ব্যালটে দেওয়া প্রশ্নপত্র না পড়েই ‘১ সেকেন্ডে’ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’তে সিল মারার কথা বলেছেন অনেক ভোটার। গণভোট দিতে কত সময় লেগেছে এবং জেনে-বুঝে দিয়েছেন কি না, সে প্রশ্নে ঢাকার শাহজাহানপুরের ভোটার সুভা সিদ্দিকী বলেন, গণভোট দিতে ১ সেকেন্ড লেগেছে। এত কিছু পড়ার দরকার কী, মা যেখানে দিতে বলছে দিয়েছি।

২২ বছরের এ শিক্ষার্থী ভোট দেন মির্জা আব্বাস মহিলা কলেজ কেন্দ্রে। একই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা আরেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হ্যাপি আক্তার বলেন, গণভোট দিয়েছি এটাই, ভোট দিতে তো এক সেকেন্ডও লাগেনি; পড়ে দিতে হবে কেন; বুঝেই দিয়েছি। মো. কবির হোসেন নামের এক ভোটার বলেন বলেন, এক মিনিটও সময় লাগেনি, বোঝেন না। রেলওয়ে স্কুলে ভোট দিতে আসা ৫৫ বছর বয়সি খলিল মিয়া বলেন, গণভোট দিছি ১ মিনিটে।

এর আগে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে গণভোট দিয়েছে দেশের মানুষ। জনগণের মতামত গ্রহণের জন্য এবারের গণভোটের ব্যালট পেপারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব প্রশ্নের বিপরীতে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হচ্ছে। ভোটের আগে সরকারের তরফে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়েছিল।

 ব্যালট পেপারের চারটি বিষয়টি উল্লেখ ছিল, যা লিখা ছিল— জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কারসম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি আছে? : (হ্যাঁ/না)
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে। 
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে। 
(গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐক্যমত্য হইয়াছে— সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে। 
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।

এফআর


  বিষয়:   নির্বাচন  গণভোট  গণরা  নতুন দিগন্ত 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: