দীর্ঘ ১৭ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের ভোটের সম্মান ফিরেছে। মূল্য বেড়েছে ভোটারের।
বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভোট শব্দটি শুধু অভিধানে ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে শেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি, যা ছিল তাদের আগের দুটি নির্বাচনের চেয়েও অভিনব। সেটি ‘আমি’ ও ‘ডামি’ নির্বাচন নামে পরিচিত লাভ করে। অর্থাৎ মূল প্রার্থী আওয়ামী লীগের, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও একই দলের— পার্থক্য শুধু স্বতন্ত্র পরিচয়। এর বাইরে ছোট ছোট কয়েকটি দলের প্রার্থীও ভোটে ছিলেন। তবে তারাও আওয়ামী লীগেরই মিত্র। সাজানো এ নির্বাচনের ফলাফলও আগে থেকে জানা ছিল, ভোট ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা।
কাগজে-কলমে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ওইবার আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে যায়। দেশের রাজনীতিতে জায়গা করে নেয় ‘রাতের ভোট’ শব্দটি। ভোটের কদর না থাকায় স্বৈরশাসক হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিল।
দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে অবিশ্বাস, অনিয়মের অভিযোগ ও ভোটার অনাগ্রহের পর সংসদ নির্বাচন নতুন করে ভোটের মর্যাদা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে নির্বাচনি পরিবেশে একটি নতুন আস্থা তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিশ্বব্যাপী ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক অনুশীলন হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা কমনওয়েলথ। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটার এবং ৭৮ জন নারীসহ মোট ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থীর অংশগ্রহণে দেশের জাতীয় নির্বাচন একটি অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার যেন অন্যরকম একটা দিন ছিল। সকাল থেকে সারা দেশেই ছিল উৎসবের আবহ। দলবেঁধে তরুণ-তরুণীরা এসেছেন। ভোট দিয়ে ছবি তুলছে, কেন্দ্রের বাইরে আড্ডায় সময় কাটাচ্ছে। প্রবীণ দম্পতি এসেছেন আগ্রহ নিয়ে; ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন দীর্ঘ সময়। অপেক্ষার পরও মুখে ছিল স্থির হাসি। অনেকের কণ্ঠে একই প্রত্যাশা একটা নির্বাচিত সরকার আসুক, গণতন্ত্র ফিরে পাক। সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ ঘটেনি। তরুণ ভোটারদের বিশেষ করে যারা এবার প্রথম ভোট দিচ্ছেন তাদের ভোটকেন্দ্রে উৎসাহ নিয়ে আসতে দেখা গেছে।
ভোট দেওয়ার পর কেন্দ্রের পাশে আড্ডা দেওয়া, সবাই মিলে সেলফি তুলছেন এমন দৃশ্যও দেখা গেছে রাজধানীর ভোটকেন্দ্রগুলোর আশপাশে। পরিবারের সদস্যরা দলবেঁধে ভোট দিতে এসেছেন এমন দৃশ্যও ছিল চোখে পড়ার মতো।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর গণতান্ত্রিক পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভোটাররা। প্রচলিত প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখছে। ভোটারদের মতামত, প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি ও নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে তাৎক্ষণিক আলোচনা ভোটকে আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করেছে। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্যের ঝুঁকিও সামনে এসেছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর সময়ের আলোকে বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ ভোট প্রদানের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ পেল। নাগরিকের সম্মান, অধিকার ও মর্যাদা এর মধ্যে নিহিত। এই অর্জনকে আমাদের টেকসই করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এই আনন্দকে, ভোটাধিকারের এই পরিবেশকে টেকসই করার মধ্যেই আগামী দিনের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে। বাংলাদেশ আর কোনো দিন ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হবে না; ভোটাধিকারের এই আনন্দ তার সুস্পষ্ট লক্ষণ।
এফআর