জয়ের পেছনে অভিজ্ঞতা পরিকল্পনায় বাজিমাত

সাব্বির আহমেদ

রাজনীতি

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। দলটি এককভাবে ২০৯ আসনে জয়লাভ করেছে, যা বিএনপির জন্য

2026-02-14T00:54:13+00:00
2026-02-14T00:54:13+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
রাজনীতি
জয়ের পেছনে অভিজ্ঞতা পরিকল্পনায় বাজিমাত
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৪ এএম   (ভিজিট : ১৫২)
প্রতীকী ছবি
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। দলটি এককভাবে ২০৯ আসনে জয়লাভ করেছে, যা বিএনপির জন্য প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন। এই জয়ের পেছনে দলটির রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ রাজপথের আন্দোলন, কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে তারেক রহমানের ভিন্নধর্মী নেতৃত্ব ও সবশেষ ভোটের প্রচারে প্রান্তিক গোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসছে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বয়ানে এমন বক্তব্যই উঠে এসেছে। কেউ কেউ সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক কৌশল অর্থাৎ, প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী-বিরোধী জনমত গঠনকেও এগিয়ে রাখছেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ২০০১ সালের পর আবারও সরকার গঠনের পথে বিএনপি। সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা পাচ্ছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে। জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ধর্মভিত্তিক দলটি পেয়েছে ৬৮টি আসন। এ ছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটে থাকা বিজেপি, গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে।

বিএনপির নবনির্বাচিত এমপি ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক সময়ের আলোকে বলেছেন, এই জয়ের পেছেনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন সংগ্রামে বিএনপির ১৬ বছরের অবদান মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া আমি মনে করি, তারেক রহমানের নির্দেশে রাষ্ট্র সংস্কারে সরা দেশে ৩১ দফাকে ছড়িয়ে দিতে পারায় জনগণের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান সময়ের আলোকে বলেন, এ নির্বাচন ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে কতকিছু বলা হয়েছিল, অনেক জরিপ হয়েছে এই হবে, সেই হবে, কত গল্পগুজব সামাজিক মাধ্যমে দেখেছি। দেশের মানুষ কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তটাই নিয়েছে। দেশে যতবার রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, প্রত্যেকবার দেশের মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা রাজনীতিকরা যখন ভুল করেছি, অর্থনীতিবিদরা যখন ভুল করেছে, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যখন ভুল করেছে, শিক্ষক সমাজ যখন ভুল করেছে, এলিট শ্রেণি যখন ভুল করেছে তখন বাংলাদেশের আপামর মানুষ ভুল করেনি।

বিভিন্ন জেলায় তৃণমূল পুনর্গঠন, প্রার্থী নির্বাচনে তুলনামূলক সতর্কতা, আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-বিরোধী জনমত তৈরি ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি অতীতে একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এবং দীর্ঘদিন প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ফলে তাদের একটি সুসংগঠিত সাংগঠনিক কাঠামো ও নির্দিষ্ট ভোটভিত্তি গড়ে উঠেছে। গত প্রায় ১৭ বছরে দলটির বহু নেতাকর্মী হামলা, মামলা, গুম ও দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলনেও বিএনপি ছিল সবসময় অগ্রগামী। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল হিসেবে ঐতিহাসিক পরিচয় এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব দলকে প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব দিয়েছে। প্রবাসে অবস্থান করেও তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতি সাধারণ ভোটারের কাছে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে, যা বড় জয়ে সহায়ক হয়েছে।

১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার সরকারগঠন করেছিল তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আর এবার তাদেরই সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি চতুর্থবারের মতো দেশ শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একানব্বইয়ের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল বিএনপি। তার পরের তিন নির্বাচনে দুইবার সরকার গঠন করলেও মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিল একবার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে দলটি চলে গিয়েছিল শাসন ক্ষমতার বাইরে। আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি নির্বাচনের দুটি বর্জন করেছিল বিএনপি, একটিতে হয়েছিল ভরাডুবি। এরপর চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর নতুন বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সরকারে ফেরার পথ তৈরি হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর মনে করেন, তারেক রহমানের আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তা ও পরিকল্পনায় মানুষ আস্থা রেখেছে। তার ত্যাগ ও পরিশ্রমকে মানুষ মূল্য দিয়েছে।

আলোচিত প্রার্থীরা কেন পরাজিত : নিরঙ্কুশ বিজয়ের পাশাপাশি বেশ কিছু আসনে বিএনপির পরিচিত ও আলোচিত প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। যদিও অনেকের ভোটের ব্যবধান খুব কম। এমন অনেক আসন ছিল বিএনপি নিশ্চিতভাবে ধরে রেখেছিল তারাই জয়ী হবে। ফলাফলে দেখা গেছে রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা জেলার সবগুলো আসনে পরাজিত হয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া বাগেরহাট, গাইবান্ধা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়াসহ কয়েকটি জেলায় মাত্র একটি করে আসনে জয়ী হয়েছে বিএনপি। এর পেছনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও কোন্দলকে দায়ী করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন

দেশের ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিল ৭৮টিতে। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থীরা জিতেছেন ৫০টিতে। আর বিদ্রোহীরা মাত্র ৭টিতে। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে জামায়াত ও তাদের জোট ২১টি  আসন পেয়েছে। 

নির্বাচনের আসনভিত্তিক বেসরকারি ফলাফল পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। জামায়াতের কাছে সবচেয়ে আসন হারিয়েছে খুলনা বিভাগে- ৮টি। বিএনপির বিদ্রোহীরা সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বিভাগে তিনটি, ঢাকা বিভাগে দুইটি, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একটি করে আসন জিতেছেন। মিত্র শরিক উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দেওয়া চারটি আসনেই পরাজিত হয়েছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। সবগুলোতেই ছিল বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ হারুনকে হারিয়ে জয় তুলে নিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল।

ময়মনসিংহ-১ আসনে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স পরাজিত হয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের কাছে। খুলনা-২ আসনে বিএনপির সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরাজিত হয়েছেন।

সবচেয়ে ধাক্কা লেগেছে রাজধানী ঢাকার আসনগুলোতে। ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক। ঢাকা-৪ আসনে হেরেছেন দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন। ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির শক্তশালী প্রার্থী মো. নবী উল্লাহও হেরেছেন জামায়াতের প্রার্থীর কাছে।

ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির আলোচিত প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলিও হেরেছেন জামায়াতের কাছে। ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির এম এ কাইয়ূম হেরেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে। গাজীপুর জেলায় একমাত্র কাপাসিয়ায় পরাজিত হয়েছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রিয়াজুল হান্নান। এসব হারার পেছনে আঞ্চলিক নানা দুর্বলতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠে এসেছে।

এএডি/


  বিষয়:   জয়  পরিকল্পনা  বাজিমাত  বিএনপি 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: