মানুষের প্রত্যাশা পূরণই বর্তমানের চ্যালেঞ্জ

রফিক রাফি

রাজনীতি

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তিত বাস্তবতার পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গণতন্ত্র, সুশাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা

2026-06-04T00:49:26+00:00
2026-06-04T00:49:46+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রাজনীতি
অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল
মানুষের প্রত্যাশা পূরণই বর্তমানের চ্যালেঞ্জ
রফিক রাফি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১২:৪৯ এএম  আপডেট: ০৪.০৬.২০২৬ ১২:৪৯ এএম
অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল। ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তিত বাস্তবতার পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গণতন্ত্র, সুশাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণ দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের কর্মকৌশলের সমন্বয় ঘটানো। এসব বিষয় সামনে রেখে বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে। একাধারে শল্যচিকিৎসক, শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মওদুদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফি

সময়ের আলো : আজ (সোমবার) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন। তাকে দেখে কেমন লাগল?

মওদুদ হোসেন আলমগীর : আমার কাছে মনে হয়েছে, তিনি সবসময় সাধারণ মানুষ হিসেবে থাকতে চান। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও মানুষের কথা শোনা এবং তৃণমূলের বাস্তবতা জানার বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মতামত ও অভিজ্ঞতা তিনি গুরুত্ব দেন বলেই মনে হয়েছে।

চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিস্থিতিতেও তিনি স্থির থাকার চেষ্টা করেন। কোনো ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় রেখে বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির মানসিকতা তার মধ্যে রয়েছে। তিনি অনুমান করতে পারেন যে এই ঘটনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী হতে পারে এবং সেটার ব্যাপারে তার অ্যাকশন প্ল্যান- এ, বি, সি, ডি থাকে এবং সেটার মাধ্যমে কিন্তু তিনি ওই ব্যাপারটা উত্তরণের চেষ্টা করেন। আরেকটি বিষয় হলো, তিনি অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ। ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং কাজের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখেন।

বিভিন্ন মহলে আলোচনা আছে, আপনি আগামীতে সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন?

আমি দায়িত্বকে পদ-পদবির আলোকে দেখি না। আমি যে জায়গা থেকে কাজ করছি আমার মনে হয় যে আমি শুধু দলের জন্য কাজ করছি না, দেশের জন্য কাজ করছি। দল তো দেশেরই একটা অংশ। ভবিষ্যতে যে দায়িত্বই আসুক, মানুষের কল্যাণ এবং নিজের নীতি-আদর্শের জায়গা থেকে কাজ করার চেষ্টা করব।

বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক হিসেবে বর্তমানে আপনার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। বিরোধী দলে থাকাকালে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান কাজ ছিল রাজনৈতিক কর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, টকশো আলোচক, কলামিস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সক্রিয় ব্যক্তিদের একটি অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ রাখা।

ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ও নির্বাচনের আগে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত ‘বট বাহিনী’র মাধ্যমে ছড়ানো অপপ্রচার, গুজব এবং সমন্বিত বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মোকাবিলা করা বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রচারণার প্রভাব মূলধারার গণমাধ্যমেও পড়তে দেখা গেছে।

নির্বাচনের আবহ তৈরি হওয়ার পর একটি গোষ্ঠী যখন ‘আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন’ তত্ত্ব প্রচার করছিল, তখন মিডিয়া সেলের চ্যালেঞ্জ ছিল ‘আগে নির্বাচন, আগেই গণতন্ত্র’- এই অবস্থানে জনগণকে ধরে রাখা। পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার বা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার বিপরীতে যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা দিয়ে মুক্তবুদ্ধির চেতনা প্রতিষ্ঠা করা ছিল অন্যতম বড় লড়াই।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের প্রত্যাশা। স্বৈরাচারীব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রে ফেরার পর জনগণ দ্রুত ফল দেখতে চায়। ফলে দল ও সরকারের কর্মকাণ্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, সরকারের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এবং বাস্তবতা ও প্রত্যাশার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা প্রয়োজন।

ধর্মের দোহাই দিয়ে সমাজের উচ্চশিক্ষিত একাংশের মধ্যেও নারী-পুরুষের অধিকারে বৈষম্য সৃষ্টির প্রবণতা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মতাদর্শগত যুদ্ধ করে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা। একই সঙ্গে অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারের কার্যক্রমের সংযোগ ঘটানোও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে আমি মনে করি।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক শক্তিশালী। এ বিষয়ে মিডিয়া সেলের পরিকল্পনা কী?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তথ্যপ্রবাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে এর ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি অপপ্রচার, গুজব এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হয়।

আমার ব্যক্তিগত মত হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। বাকস্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, গুজব বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বাকস্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমাজে বিভ্রান্তি ও উসকানি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার। 

বাণিজ্যিক স্বার্থে প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক সময় অপপ্রচার বন্ধ করতে চায় না। তাই ধর্মীয় বা সংবেদনশীল বিষয়ে সমাজবিধ্বংসী গুজব ও উসকানি রুখতে সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি নিয়মনীতি বা রেগুলেশনের আওতায় আনা জরুরি।

এটা তো নীতিমালা বা আইনের বিষয়। মিডিয়া সেলের নিজস্ব পদক্ষেপ কী হবে?

আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো, কোনো অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে যত দ্রুত সম্ভব সঠিক তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। এ জন্য মিডিয়া সেলের সদস্যরা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান। ‘বট বাহিনী’র গভীর রাতে পোস্ট ভাইরাল করার কৌশল মোকাবিলায় মিডিয়া সেলের কর্মীরা শিফট অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেন। অর্থের বিনিময়ে চালিত বট বাহিনীর হাজার হাজার লাইক-কমেন্টের ভিড়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের কমেন্টটি অনেক সময় নিচে পড়ে যায়। বর্তমান বাস্তবতায় সংগঠিত প্রচারণা মোকাবিলা করা সহজ নয়। তবু আমরা বিশ্বাস করি, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল যোগাযোগই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। কোনো তথ্য দেখামাত্র বিশ্বাস না করে তার উৎস ও সত্যতা যাচাই করার সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

আপনি পেশায় একজন চিকিৎসক, আবার বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়কও। দুটি ক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় করেন কীভাবে?

বাইরে থেকে দুটি ক্ষেত্র আলাদা মনে হলেও মূল ভিত্তি অনেকটা একই- মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ। একজন চিকিৎসককে যেমন রোগীর আস্থা অর্জন করতে হয়, তেমনি রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও মানুষের কাছে তথ্য, যুক্তি ও অবস্থান বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে হয়। আপনারাও সংবাদপত্রের মাধ্যমে কিন্তু এটাই তৈরি করেন।

আমি কখনো দায়িত্ব ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয় হিসেবে দেখি না বরং এটি মানুষের সঙ্গে কাজ করার একটি সুযোগ। গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করি। অনেক সময় কোনো তথ্য বা বিভ্রান্তি সংবাদে আসার আগেই আলোচনা ও যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করার সুযোগ তৈরি হয়। আমি মনে করি, এই যোগাযোগের সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক হিসেবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

স্বাস্থ্য খাত এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ডাক্তার-রোগীর মধ্যে আস্থার ঘাটতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা বড় উদ্বেগের বিষয়। এসব কারণে অনেক মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে শিশুমৃত্যু ও ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংকটগুলোও দেখিয়েছে যে আগাম প্রস্তুতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাই। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং এবং দলের ‘৩১ দফা’ ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নীতিগত অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা গেলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করা সম্ভব।


  বিষয়:   সাক্ষৎকার  অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: