নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এখন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভা মঙ্গলবার শপথ নেবে। ঐতিহ্যগতভাবে বঙ্গভবনে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান হলেও বিএনপির অভিপ্রায়ে এবার তা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় (সাউথ প্লাজা) হবে।
নতুন এই মন্ত্রিসভার চেহারা কেমন হতে যাচ্ছে এবং সেখানে কারা জায়গা পেতে যাচ্ছেন, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল। মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে বিজয়ীদের কারও কারও পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানোর ঘটনাও চোখে পড়ছে।
যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন মন্ত্রিসভার আকার ও চেহারার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে আভাস মিলেছে, অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) মন্ত্রিসভার ঘোষণা আসতে পারে। এর আকার হবে শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রিসভার তুলনায় ছোট।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিএনপি তাদের মন্ত্রিসভার আকার প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে বলে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এতে টেকনোক্র্যাট কোটায়ও যুক্ত হচ্ছেন কেউ কেউ। এর মধ্যে ২০০১-২০০৬ মেয়াদের মন্ত্রিপরিষদের দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে এবারও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করছে বিএনপি। নিজ দলের বাইরে ভোটে জয় পাওয়া সমমনা অন্য দলগুলোর নেতাদের মধ্যেও অনেকে সেই মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন বলে আভাস দিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা।
নতুন মন্ত্রিসভায় নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা আব্বাস, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন বীর বিক্রম এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ আরও বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার আলোচনায় আরও রয়েছেন সিলেট-৪ আসন থেকে বিজয়ী আরিফুল হক চৌধুরী, কুমিল্লা-২ আসন থেকে বিজয়ী সেলিম ভূঁইয়া, চাঁদপুর-১ আসন থেকে বিজয়ী এহসানুল হক মিলন, রাজশাহী-২ আসন থেকে বিজয়ী মো. মিজানুর রহমান মিনু, নোয়াখালী-২ আসন থেকে বিজয়ী জয়নাল আবেদিন ফারুক, খাগড়াছড়ি আসন থেকে বিজয়ী নির্বাচিত আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা, বান্দরবান আসন থেকে বিজয়ী থেকে নির্বাচিত সচিং প্রু।
ঢাকার সংসদ সদস্যদের মধ্যে মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন ঢাকা-২ আসন থেকে বিজয়ী আমানউল্লাহ আমান, ঢাকা-৩ আসন থেকে বিজয়ী গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা-৮ আসন থেকে বিজয়ী মির্জা আব্বাস। এ ছাড়া গাজীপুর-৫ আসন থেকে বিজয়ী ফজলুল হক মিলন, নরসিংদী-১ আসন থেকে বিজয়ী খায়রুল কবীর খোকন থাকতে পারেন। টাঙ্গাইলের দুই আসন থেকে দুই ভাই আবদুস সালাম পিন্টু ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিজয়ী হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে একজন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন।
নারীদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলামের নামও আলোচনায় রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ফরিদপুর-২ আসন থেকে শামা ওবায়েদ জয় পেয়েছেন।
এ ছাড়া তরুণ নেতাদের মধ্যে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী হিসেবে যারা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন, তাদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৩ আসন থেকে বিজয়ী বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, খুলনা-৪ আসন থেকে বিজয়ী আজিজুল বারী হেলাল, নেত্রকোনা-১ আসন থেকে বিজয়ী কায়সার কামাল, মাদারীপুর-৩ থেকে বিজয়ী আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, ঝিনাইদহ-১ আসন থেকে বিজয়ী মো. আসাদুজ্জামান, যশোর-৩ আসন থেকে বিজয়ী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বিগত সময় বিএনপির সঙ্গে যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিলেন সেই মিত্র দলগুলোর নির্বাচিত নেতাদের সরকারে রাখতে চায় বিএনপি। এবারের নির্বাচনে মিত্র দলের সাতজন নেতা নিজ দল ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। তাদের মধ্যে ঢাকা-১৩ আসন থেকে ববি হাজ্জাজ এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে শাহাদাত হোসেন সেলিম জয় পেয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী হিসেবে তাদের নামও আলোচনায় আছে।
বিগত সময় বিএনপির সঙ্গে যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিলেন সেই মিত্র দলগুলো থেকে মাত্র তিনজন জয় পেয়েছেন। তারা হলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর।
তারা তিনজনই নতুন মন্ত্রিসভায় ডাক পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। এ ছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হতে পারেন রুহুল কবির রিজভী, হাবিবুন নবী খান সোহেল। সংবিধান অনুযায়ী মোট মন্ত্রীর এক-দশমাংশ পর্যন্ত টেকনোক্র্যাট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায়।
অন্যদিকে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে যারা এবারের মন্ত্রিসভায় থাকছেন না তাদের মধ্যে কেউ কেউ জায়গা পেতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে। তাদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে যারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন, তাদের যাতায়াতের জন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এই গাড়িগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখার অর্থ এই নয় যে ৫০ জন মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সাধারণত মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্য সংখ্যার চেয়ে কিছু বেশি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয় ব্যাকআপ হিসেবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা শপথের দিন উপস্থিত থাকবেন, তারা নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী শপথে অংশ নেবেন এবং সেদিন পতাকাবাহী গাড়িতে করে অনুষ্ঠানে যাবেন। শপথ অনুষ্ঠান শেষে একই গাড়িতে তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে, তবে ফেরার সময় গাড়িতে পতাকা থাকবে না।
নিয়ম অনুযায়ী বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মন্ত্রিসভার শপথ পড়াবেন। এবারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফসহ অনেক দেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এর বাইরে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক ব্যক্তিবর্গ শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
সময়ের আলো/এআর