ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে। প্রাপ্ত ভোটের হার এতটাই তলানিতে যে জামানত রক্ষা করতে পারেনি অনেকে। ভোটের হারের পর এবার জামানতও বাজেয়াপ্ত হচ্ছে তাদের। তিনশ আসনে মোট কতজন প্রার্থী জামানত হারিয়েছে তার সঠিক তথ্য এখনও জানাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে বেশ কয়েকটি জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ১২৫টি আসনে ৪০০ জন প্রার্থী জামানত রক্ষা করতে পারেনি। এই তালিকায় সাবেক এমপি ও অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীও রয়েছে। দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি জামানত হারিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন ও জাপার প্রার্থীরা।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংষদ নির্বাচন ও গণভোট। এ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ইসির প্রকাশিত ২৯৭টি আসনের ভোটের হার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে একক দল হিসেবে জয় পেয়েছে মাত্র আটটি দল। এর মধ্যে প্রায় পৌনে চার কোটি ভোট পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যা মোট ভোটের ৪৯.৯৭ শতাংশ। এ নির্বাচনে বিএনপির ২৯০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। ভোটের হিসেবে যা সোয়া দুই কোটির বেশি ভোট। ভোটের মাঠে ২২৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দলটি। এ ছাড়া ১০টি দল পেয়েছে শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য শতাংশ ভোট। বেশিরভাগ দলই একটি করে আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি কিংবা ভোটের হারও তলানিতে। যে কারণে অনেকেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হতে চলছে।
ইসির পরিচালক (জনসংযোগ) রুহুল আমিন মল্লিক সময়ের আলোকে বলেন, তিনশ আসনে কতজন প্রার্থীর জামানত বাতিল হয়েছে তা এখনও চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি। তবে কাজ চলমান রয়েছে। শিগগিরই জামানত বাজেয়াপ্তের তালিকা প্রকাশ করা হবে।
একজন প্রার্থীকে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইলে নির্বাচন কমিশনে তাকে ৫০ হাজার টাকা জামানত রাখতে হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের আরপিও অনুযায়ী শর্ত থাকে যে, প্রার্থী নির্বাচনে মোট বৈধ ভোটের কমপক্ষে ১২.৫ শতাংশ না পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বেশিরভাগই এ সীমা পার করতে পারেনি। জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য থেকে জানা যায়, ১২৫টি আসনে জামানত হারিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৪০০ জন প্রার্থী।
গাইবান্ধার পাঁচটি আসনে জামানত হারালেন ২৬ প্রার্থী : গাইবান্ধার পাঁচটি আসনে ৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জন প্রার্থীই তাদের জামানত হারিয়েছেন। এর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ও গাইবান্ধা-১ আসনের জাতীয় পার্টি মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী রয়েছেন। লাঙ্গল প্রতীকে ৩ হাজার ৩৭৫ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন তিনি। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আসনে মোট বৈধ ভোট পড়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৫২টি। জামানত টিকিয়ে রাখতে শামীম হায়দার পাটোয়ারীর প্রয়োজন ছিল ২৬ হাজার ৬৫৬ ভোট। কিন্তু তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ৩৭৫ ভোট।
চট্টগ্রামে ৫৯ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত : চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করা ১৪টি আসনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির প্রার্থীসহ ৫৯ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ১৬টি সংসদীয় আসনের মোট প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ১১৫ জন। তার মধ্যে ১৪টি আসনে প্রার্থী ছিলেন ৯৮ জন। তাদের মধ্যে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে ৬০ শতাংশের।
কুমিল্লায় ৫৭ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত : কুমিল্লার ১১টি আসনের ৮৩ প্রার্থীর ৫৭ জনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা ৫০ হাজার টাকা জামানত হারিয়েছেন। জামানত ফেরত পাবেন মাত্র ২৬ প্রার্থী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কোনো প্রার্থীই কুমিল্লায় তাদের জামানত ফেরত পাচ্ছেন না। খাগড়াছড়ির একমাত্র ২৯৮ নম্বর সংসদীয় আসনে ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে সাতজনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ১ লাখ ৪৮ হাজার ২১২ ভোট পেয়েছে বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের ধর্মজ্যোতি চাকমা পেয়েছেন ৫৮ হাজার ১৩৬ ভোট।
খুলনায় জামানত হারালেন জাপা ও ইসলামী আন্দোলনসহ ২৬ প্রার্থী : খুলনার ছয়টি আসনে ২৬ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ২৬ জন জামানত হারিয়েছেন।
যশোরে ২৪ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত : যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী ৩৭ প্রার্থীর মধ্যে ২৪ জনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী সবকটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। জামানত হারানো প্রার্থীদের মধ্যে জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) পাঁচজন, ইসলামী আন্দোলনের (হাতপাখা) ছয়জন, আমার বাংলাদেশ এবি পার্টির (ঈগল) দুজন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের (মই) একজন, খেলাফত মজলিসের (দেয়ালঘড়ি) একজন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফের (টেলিভিশন) একজন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার (চশমা) একজন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (কাস্তে) একজন, বাংলাদেশ মাইনরিটির জনতা পার্টির-বিএমজেপি (রকেট) একজন, গণঅধিকার পরিষদের (ট্রাক) একজন ও স্বতন্ত্র পাঁচজনের মধ্যে চারজন (মোটরসাইকেল, ফুটবল, ঘোড়া, কলস)।
বাগেরহাটে ১৪ প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন : সংসদ নির্বাচনে বিধি মোতাবেক ভোট না পাওয়ায় বাগেরহাটের ৪টি সংসদীয় আসনে ২৩ প্রার্থীর মধ্যে ১৪ জন প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন। নির্বাচনে বিএনপির ৪ জন ও জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া বাকি সব প্রার্থীর জামানত থাকছে না।
জামালপুরে ২৪ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত : জামালপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২৪ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে ১৪ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত : ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ২০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৪ জনই জামানত হারিয়েছেন। জামানত খোয়ানো এসব প্রার্থীর তালিকায় সাবেক দুই সংসদ সদস্যও রয়েছেন। জেলার তিনটি আসনে লড়াই হয়েছে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে। এ দুই দলের প্রার্থী বাদে বাকিরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সিরাজগঞ্জে ২৭ জন জামানত হারিয়েছেন : সিরাজগঞ্জ জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৭ জনই তাদের জামানত হারিয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ জন প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট চার অঙ্কের ঘরেও পৌঁছাতে পারেনি।
মাদারীপুরে ১৭ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত : মাদারীপুরের তিনটি আসনে মোট ২৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট না পাওয়ায় ১৭ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। তিনটি আসনের ফলাফলে বিজয়ী প্রার্থীরা স্বল্প ব্যবধানে জয় পেলেও অধিকাংশ প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোট সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছেন।
রাজশাহীর ২০ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত : রাজশাহীতে জামানত হারিয়েছেন ছয়টি সংসদীয় আসনের ২০ জন প্রার্থী। ভোটের ফলাফলে ছয়টি আসনের মধ্যে বিএনপি চারটি ও জামায়াত দুটি আসনে বিজয়ী হয়েছে।
সিলেটে জামানত হারালেন ২০ প্রার্থী : সিলেটের ছয়টি আসনে মোট ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এর মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোট না পেয়ে জামানত হারিয়েছেন ২০ জন প্রার্থী।
বরিশালের ২১ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত : বরিশাল জেলার ছয়টি আসনের ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২১ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
রংপুর বিভাগে জামানত হারালেন ৯ নারী প্রার্থী : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনে লড়েছেন ৯ নারী প্রার্থী। তাদের মধ্যে চারজন ছিলেন স্বতন্ত্র। ভোটের লড়াইয়ে প্রত্যাশিত সাফল্য তো দূরের কথা, প্রত্যেকেই জামানত হারিয়েছেন। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৮৭৬ এবং সর্বনিম্ন ১৫৩।
কুষ্টিয়ায় ১৭ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া জেলায় ৪টি সংসদীয় আসনে ১৭ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার চারটি সংসদীয় আসনে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ১৪টি রাজনৈতিক দলের ২৫ জন অংশগ্রহণ করেন।
চাঁদপুরে পাঁচটি আসনে ২৫ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত : চাঁদপুরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে জেলার পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৫ জনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। জেলার পাঁচটি আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী ৫০ হাজারের বেশি ভোট পেলেও বাকি ২৫ জন ১৫ হাজারের নিচে ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন।