বিএফইউজে মহাসচিব ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, তারেক রহমান ক্ষমতায় এসে জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। ডেল্টাগ্রামের জনমত জরিপে সরকারের প্রতি ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ সমর্থন ও সন্তুষ্টির তথ্যই এর প্রমাণ বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বলতে আমার দ্বিধা নেই, তারেক রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে ব্যক্তিবৃত্ত থেকে ক্ষমতা এখন জনগণের আঙিনায়।’
মঙ্গলবার সকালে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়) যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্র জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের সভাপতি নাছিম আহমদের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট জাকির এইচ চৌধুরী, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ আলী খান, সিনিয়র সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম, জাকারিয়া আহমেদ, মাহবুবুর রহমান, আল মামুন সবুজ, নুর আলম, মোতাহার হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, শাহাবুদ্দীন, শাহ আলম শিমুল, শাহ আলম, শাহদাত হোসেন, ফরহাদ মৃধা, হারুন অর রশিদ, হামিদুল্লাহ খান, রাইসুল ইসলাম রাব্বি ও শামীম মাহমুদসহ অনেকে।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের যে উন্নয়ন হয়েছে, তার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ বিএনপির অবদান। তার দাবি, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কারণে এসব উন্নয়ন হয়েছে। দেশের মানুষ আগামীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জনগণ তাঁদের এই চিন্তার প্রতিফলন ঘটাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তারেক রহমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ডলার ও রুপির বিপরীতে সাড়ে পাঁচ বছরে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে টাকা। এর ফলে বিদেশি ও আমদানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। বিনিময় হার আরও স্থিতিশীল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের আস্থাও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন রেকর্ড হয়েছে বলেও দাবি করেন কাদের গনি চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে এসব বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে রেকর্ড ৬৪২ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা এক মাসে এ খাতে সর্বোচ্চ রপ্তানি।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সংস্কার ও ঋণ আদায়ে জোরালো উদ্যোগের ফলে গত নয় মাসে দেশে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমাণ প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে এনপিএল অনুপাত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে নেমেছে।
শুধু অপ্রচলিত বাজার নয়, যুক্তরাষ্ট্রেও পোশাক রপ্তানিতে রেকর্ড হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে দেশটির বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির গতি এবং আগস্টে একক মাসে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সাংবাদিকদের এই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধেও রেকর্ড করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। তাঁর দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসে বিএনপি সরকার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া বিপুল ঋণের বাড়তি পরিশোধের চাপের মধ্যেও বর্তমান সরকার নিয়মিতভাবে এই দায় পরিশোধ করে যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর সংসদে প্রশ্ন, পাল্টা প্রশ্ন, আলোচনা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি দৃশ্যমান হয়েছে। প্রথম অধিবেশনেই ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তির উদ্যোগও প্রাতিষ্ঠানিক ধারায় ফেরার ইঙ্গিত বহন করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সীমিত গাড়িবহর কিংবা তাঁর চলাচলের সময় দীর্ঘক্ষণ সড়ক বন্ধ না রাখার সিদ্ধান্ত সরাসরি জিডিপি বাড়াবে বা মূল্যস্ফীতি কমাবে না। তবে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রদর্শন যত কম হবে, সাধারণ নাগরিকের প্রতি সম্মানের বিষয়টি তত বেশি দৃশ্যমান হবে। সরকারি গাড়ি কেনায় নিয়ন্ত্রণ, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ সীমিত করা এবং সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগও একই বার্তা বহন করছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার মূল বেতনের ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, এগুলো ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বড় একটি অংশ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এর অন্যতম দৃশ্যমান উদ্যোগ ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পরীক্ষামূলকভাবে হাজার হাজার পরিবারকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখানে শুধু অর্থের পরিমাণই গুরুত্বপূর্ণ নয়; সামাজিক নিরাপত্তাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক করার চেষ্টাটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের পরিবারের সব প্রয়োজন এই অর্থে পূরণ না হলেও খাদ্য, শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো জরুরি কোনো একটি খাতে এটি স্বস্তি দিতে পারে।
কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’-এর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কৃষি এখনো দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৃষি উপকরণ, ঋণ ও সরকারি সেবা সহজে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন জেলায় কৃষক কার্ড কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কৃষিঋণ ও সংশ্লিষ্ট সুদ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি ১৩ লাখ কৃষক পরিবারের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী ভাতা এবং দেশজুড়ে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পবিত্র রমজান ও ঈদে কৃত্রিম সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধে সম্প্রতি ২ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সংসদে রেকর্ড সংখ্যক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করেছে। সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় যুক্ত করা, মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল, ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং শিক্ষার্থীদের সংসদে উপস্থিতির সুযোগসহ ক্রীড়া ও উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
স্বাস্থ্য খাতেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘হেলথ কার্ড’, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্যনায় পরিবেশ ও জলবায়ুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জলবায়ু বাজেট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, নদী-খাল পুনঃখনন এবং বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচি ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্প করার উদ্যোগ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জলবায়ুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জলবায়ু বাজেট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, নদী-খাল পুনঃখনন এবং বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচি ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ