বড় ধরনের কোনো সংঘাত-সহিংসতা ছাড়াই হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। জাতীয় এই নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছিল পুলিশের শীর্ষ নেতৃত্ব। নির্বিঘ্নে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাসহ অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনবান্ধব হয়ে উঠতে পুলিশকে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। শুধু সংঘাতমুক্ত একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুলিশের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। নতুন সরকারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পুলিশকে পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
২০২৪ সালের শেষভাগে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশের দমন-পীড়ন ও আগ্রাসী আচরণ জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ৫ আগস্টের পর পালিয়ে যান পুলিশের শীর্ষ অনেক কর্মকর্তা। জনরোষের শিকার হন অনেক পুলিশ সদস্য। পুড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের অনেক থানা ও ফাঁড়ি। পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশের পোশাক পরিবর্তনসহ পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে।
কমিশন শতাধিক সংস্কারের সুপারিশ করে। এর মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে সরকারের দেওয়া ১৮টি সুপারিশের মধ্যে ১১টি বাস্তবায়ন করেছে পুলিশ। বাকিগুলো এখনও আটকে আছে বিভিন্ন কারণে। তবে পুলিশকে জনবান্ধব করতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বহু আগে থেকেই দাবি জানানো হচ্ছিল। পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হলে পুলিশে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। সংস্কার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যকর স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার এই দাবি করা হচ্ছিল। আর এ জন্য দরকার ছিল একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন। অথচ এখনও সেই কমিশন হয়নি। যদিও আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে উপদেষ্টাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি পুলিশ কমিশনের কাঠামো ও কার্যক্রমের খসড়া তৈরি করে।
খসড়ায় প্রস্তাব করা হয় আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি স্বশাসিত কমিশন গঠনের। তবে পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি আগের মতোই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। কমিশন শুধু এসব বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন ও সুপারিশ করবে। তবে এতে পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমও জাতীয় নির্বাচনের আগে তার সবশেষ প্রেস কনফারেন্সে এ বিষয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক অপরাধ বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক এ প্রসঙ্গে গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি, যা হতাশাজনক। নতুন সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তবেই একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা অনেকটা সহজতর হবে।
এই অপরাধ বিজ্ঞানী আরও বলেন, পুলিশ এখনও আগের জায়গাতেই আছে। পুলিশের বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা এখনও পূরণ হয়নি। পুলিশকে যতদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে ততদিন পুলিশ জনবান্ধব হতে পারবে না। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে নতুন সরকার কী চায়। তা ছাড়া পুলিশ নিজেরা তাদের পরিবর্তন চায় কি না এটিও বড় বিষয়। নতুন সরকারের ভাবমূর্তি নির্ভর করবে পুলিশের কার্যক্রমের ওপর। একই সঙ্গে জনগণের স্বার্থও জড়িত তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে। সবশেষ তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পুলিশ তাদের নেতিবাচক ভাবমূর্তি দূর করতে পেরেছে এটি কোনোভাবেই বলার সুযোগ নেই।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা সময়ের আলোকে বলেন, পুলিশকে তার কাজ দিয়ে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজটি বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথভাবে পরিচালিত হয়। তাই শুধু একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ নেই। সাবেক এই আইজিপি বলেন, আইনের বইতে যা লেখা আছে সেই অনুযায়ী যদি পুলিশ কাজ করে তবেই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনে পুলিশের একক কোনো কৃতিত্ব নেই। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিত প্রয়াসে নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুলিশ তাদের ভাবমূর্তি ফিরে পেয়েছে এটি বলার কোনো সুযোগ নেই। এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, নতুন বন্দোবস্ত অনুযায়ী পুলিশকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে দিতে হবে। তা হলেই ধীরে ধীরে এই বাহিনী জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী মাঠ থেকে উঠে গেলে পুরো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের ওপর এসে যাবে। সেনাবাহিনীকে একসঙ্গে উঠিয়ে না নিয়ে পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে নিলে পুলিশের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচনের দিনসহ ৩ দিনে ২১০ সহিংসতা : নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী দুদিনে সারা দেশে ২১০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, শারীরিক হামলা, হুমকি ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা রয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ৫৩ শতাংশই শারীরিক হামলা। বাড়িঘর, অফিস-চেম্বারে হামলা হয়েছে ১৪ শতাংশ, ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রে হুমকি দেওয়া হয়েছে, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য সহিংসতা হয়েছে ১০ শতাংশ।
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি : প্রতিবেদন ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্সের (ইডব্লিউএ) প্রধান মো. শরিফুল আলম। সংবাদ সম্মেলনে অ্যালায়েন্সের পক্ষ থেকে নির্বাচন এবং তার পরবর্তী দুদিনসহ মোট তিন দিনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সারা দেশে সংস্থাটির নিজস্ব মনিটরিং এবং মূলধারার গণমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, মূলধারার গণমাধ্যমে সহিংসতার সবটুকু তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ে পর্যবেক্ষণে সহিংসতার চিত্র অনেক বেশি। সংস্থাটির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মনিটরিং টিমের পাঠানো তথ্য অনুসারে, এই তিন দিনে ২১০টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
শরিফুল আলম বলেন, ভোট আপাত শান্তিপূর্ণ মনে হলেও কাঠামোগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। কিছু আমলা, পুলিশ, আনসার সদস্য ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিষয়গুলো নিয়ে গভীর অনুসন্ধান দরকার।
এর আগে গত রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রথম এক সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) পক্ষ থেকে বলা হয়, সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনেকটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হলেও ফলাফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী এসব সহিংসতায় এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।