নতুন সূর্য, নতুন ভোর। কিন্তু অন্য দিনগুলোর মতো না। চারপাশের মানুষ একই থাকলেও বদলে গেছে সময়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যরা কোনো বিভাজন ছাড়াই শপথ নিয়েছেন। একই দিনে তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন। এই শপথের মধ্য দিয়ে তার নেতৃত্বে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠন করেছে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
নতুন মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই নির্বাচিত সরকারকে ঘিরে দেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। গণতান্ত্রিক যাত্রা নতুন করে শুরু করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে জনমনে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এখন শুরু হচ্ছে নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চা ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের নতুন পথচলা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে বাংলাদেশে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বৈরাচারী সরকারের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয় বিএনপি। সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। এরপর দায়িত্ব নেয় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
এই সরকারের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি উৎসবমুখর সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। এর আগে দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর তিনি ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন এবং ৩০ ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েক দিন পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার প্রায় দুই দশক পর তার নেতৃত্বেই দলটি আবার ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো। ২০০৭ সালে মার্চে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি।
ইতিমধ্যে তারেক রহমান তার বক্তব্যে বিভেদ ঘুচিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। এতে সর্বস্তরে একটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমান এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক ভাগ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে। একই পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্র পরিচালনার বিরল নজির স্থাপিত হতে যাচ্ছে- রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান। বাবা-মা ও ছেলের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন নয়, তবে বাবা-মা ও ছেলে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসার ঘটনা বিরল। উপমহাদেশে বাবা-মা ও ছেলে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বিতীয় নজির।
তারেক রহমানের শৈশব কেবল প্রভাব বা ক্ষমতার পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি গড়ে উঠেছিল চলমানতা ও ইতিহাসের প্রবাহের মধ্য দিয়ে। ঢাকার বাইরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল তারেক রহমানের পরিচয় গঠনে ভূমিকা রেখেছে। তার মাতামহ-মাতামহী দিনাজপুরে বাস করতেন। খালেদা জিয়ার জন্ম জলপাইগুড়িতে এবং তিনি দিনাজপুরে বেড়ে ওঠেন। তবে খালেদা জিয়ার পৈতৃক শিকড় ফেনীতে। এসব স্থান থেকে তারেক রহমান গ্রামীণ জীবনের গল্প, পারিবারিক বন্ধন এবং গভীর সামাজিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পিতৃপক্ষের শিকড় জিয়াউর রহমানের নিজ জেলা বগুড়ায়। বগুড়া প্রতীক হয়ে উঠেছিল বিনয়, তৃণমূলের সংযোগ এবং দৃঢ়তার। এখান থেকে তারেক রহমান শিখেছেন কেবল রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, মাটির সঙ্গে যুক্ত থাকার অর্থ।
ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে সিলেটকে তারেক রহমানের আবেগিক ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত করে, যা রাজনীতির মাধ্যমে নয়, পরিবারের বন্ধনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রবাসী ঐতিহ্য, শিক্ষা এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য সুপরিচিত সিলেট তাকে কেবল জাতীয় নেতা হিসেবে গ্রহণ করেনি, তাকে নিজেদের একজন হিসেবে মেনে নিয়েছে। নির্বাচনি প্রচারে সিলেট সফরের সময় জনতা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান দেয়নি। বরং শোনা গেছে ‘দুলা ভাই, দুলা ভাই’ ধ্বনি। সিলেটি সংস্কৃতিতে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এটি স্নেহ, পরিচিতি এবং আস্থার প্রকাশ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো অনেক সিলেটবাসী তাকে দামান (সিলেটি ভাষায় জামাই) হিসেবে উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিন গণতন্ত্রহীনতার অধ্যায় পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে বিএনপি। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মুখোমুখি দেশ। খালেদা জিয়া ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার প্রায় দুই দশক পর প্রধানমন্ত্রী হলেন তার ছেলে তারেক রহমান, যিনি এই ভূমিধস বিজয়ের প্রধান কারিগর। এর আগে ২০০১ সালেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন তারেক রহমান।
তারেক রহমানের নতুন সরকারে সবচেয়ে বেশি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এসেছেন ঢাকা বিভাগ থেকে; ভাগে সবচেয়ে কম পেয়েছে সিলেট বিভাগ। নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে নির্বাচনি আসন ও জন্মসূত্রে ঢাকা বিভাগের ১৩ জন। বিপরীতে সিলেট বিভাগের বাসিন্দারা পেয়েছেন দুজন পূর্ণ মন্ত্রী। সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চট্টগ্রাম বিভাগ; এই বিভাগ থেকে ১১ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। পাঁচজন করে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রাজশাহী, রংপুর ও বরিশাল বিভাগের। খুলনা ও ময়মনসিংহ পেয়েছে চারজন করে।
ঢাকা বিভাগ : মন্ত্রীদের মধ্যে খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), শামা ওবায়েদ ইসলাম, আফরোজা খানম রিতা, সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, ফকির মাহবুব আনাম, শেখ রবিউল আলম এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে শরিফুল আলম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), হাবিবুর রশিদ, ইশরাক হোসেন, ববি হাজ্জাজ ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম ঢাকা বিভাগের।
চট্টগ্রাম বিভাগ : মন্ত্রীদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহছানুল হক, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট) এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, জোনায়েদ সাকি চট্টগ্রাম বিভাগের।
রাজশাহী বিভাগ : মন্ত্রীদের মধ্যে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মিজানুর রহমান মিনু এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে মীর শাহে আলম, ফারজানা শারমিন ও এম এ মুহিত রাজশাহী বিভাগের।
রংপুর বিভাগ : মন্ত্রীদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, আসাদুল হাবিব দুলু এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে ফরহাদ হোসেন আজাদ ও আব্দুল বারী রংপুর বিভাগের।
বরিশাল বিভাগ : মন্ত্রীদের মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে রাজীব আহসান, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর ও নুরুল হক নুর বরিশাল বিভাগের।
খুলনা বিভাগ : মন্ত্রীদের মধ্যে নিতাই রায় চৌধুরী, মো. আসাদুজ্জামান এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও শেখ ফরিদুল ইসলাম খুলনা বিভাগের।
ময়মনসিংহ বিভাগ : এ বিভাগ থেকে কেউ মন্ত্রী হতে পারেননি। এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, কায়সার কামাল, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
সিলেট বিভাগ : খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরী মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এই বিভাগ থেকে কেউ প্রতিমন্ত্রী হননি।
সময়ের আলো/কেএইচও