চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮৭ জন নিহত এবং এক হাজার ১৯৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬৮ জন নারী ও ৫৭ শিশু। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, যা মোট নিহতের ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের জানুয়ারি মাসের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক এ চিত্র উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমে এ প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান।
প্রতিষ্ঠানটি ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০৮টি। এতে নিহত হয়েছেন ১৯৬ জন, যা জানুয়ারিতে দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ। মোট দুর্ঘটনারও ৩৭ দশমিক ২০ শতাংশ মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। পথচারীদের ঝুঁকিও উদ্বেগজনক। এ সময় সড়কে ১৩২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ২৭ দশমিক ১০ শতাংশ। এ ছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭ জন।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাসযাত্রী নিহত হয়েছেন ২১ জন, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও ট্রাক্টরের আরোহী ২৮ জন, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের যাত্রী ৯ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী ৭৭ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৩ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ১১ জন। মোট ৮৮৫টি যানবাহন দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। এর মধ্যে ২১৭টি মোটরসাইকেল, ১৬৪টি থ্রি-হুইলার, ১৪৪টি ট্রাক ও ১০৮টি বাস রয়েছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কে ১৫৬টি, আঞ্চলিক সড়কে ২০৭টি, গ্রামীণ সড়কে ৮৫টি এবং শহরের সড়কে ১০৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২০৯টি, মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩৫টি, পথচারীকে চাপা দিয়ে ১৩৭টি এবং পেছন থেকে আঘাতে ৭২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সময়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে সকালে সবচেয়ে বেশি— ২৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাতে ঘটেছে ২৩ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং দুপুরে ১৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১৪৩টি দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৮ জনের। রাজধানী ঢাকায় ২৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮ জন।
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়কব্যবস্থা, বেপরোয়া গতি, চালকের অদক্ষতা ও মানসিক চাপ, নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টার অভাব, ট্রাফিক আইন অমান্য, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে গড়ে দৈনিক মৃত্যুর হার কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ১৯ দশমিক ৬১ জন নিহত হলেও এবার তা ১৫ দশমিক ৭০ জনে নেমেছে। অর্থাৎ প্রায় ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। সংগঠনটির মতে, এটি টেকসই উন্নতির ইঙ্গিত নয়; সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।
দুর্ঘটনা রোধে দক্ষ চালক তৈরি, চালকদের নির্ধারিত বেতন ও কর্মঘণ্টা, ট্রাফিক আইন কঠোর প্রয়োগ, মহাসড়কে সার্ভিস রোড ও ডিভাইডার নির্মাণ, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর গতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।
এফআর