গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে রাজধানীতে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে একটি অপরাধী সিন্ডিকেট। কখনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতে, কখনো আবার ঘুমের ওষুধ খাইয়ে লুটে নিচ্ছে স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সম্পদ। এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত আছে চোরাই স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। রাজধানীর সুউচ্চ ভবনে বসবাসরত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, একাকী বসবাসকারী নারী-শিশুরাই এদের মূল টার্গেট।
কয়েক মাসের ব্যবধানে সম্প্রতি রাজধানীতে এরকম একাধিক ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়ার আগে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে গৃহকত্রীকে হত্যা করে টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরির ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত গৃহকর্মী বিলকিস বেগমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।
এ ঘটনায় সিন্ডিকেটের সদস্য চোরাই স্বর্ণের ক্রেতা জুয়েলারি দোকান মালিক রবিউল আউয়ালকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে এ সিন্ডিকেট সম্পর্কিত বেশ কিছু তথ্য। পুলিশ জানায়, গ্রেফতার বিলকিস দীর্ঘদিন ধরে এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলাও আছে।
রোববার রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ের পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্তি উপমহাপরিদর্শক মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত এক নারী মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতনে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয়। কেয়ারটেকারের কাছে নিজের নাম ‘মমতাজ’ এবং বাসার সদস্যদের কাছে ‘মারুফা’ পরিচয় দিলেও সে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ঠিকানা পরে দেবেন বলে জানান।
এর তিন দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে বৃদ্ধ দম্পতির ছোট ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে মিরপুরে শ্বশুরবাড়িতে যায়। এ সময় বাড়িতে শুধু বৃদ্ধ দম্পতি আয়শা আক্তার ও আনোয়ার হোসেন অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যায় তাদের বড় ছেলে মো. জাকারিয়া হোসেন ফোনে বাবার অসংলগ্ন কথা শুনে বাসায় ফিরে দেখেন, তার মা বিছানায় অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন এবং বাবা অসুস্থ হয়ে কাতরাচ্ছেন। তাদের দ্রুত উত্তরার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আয়শা আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। আনোয়ার হোসেন বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
পিবিআই জানায়, পরিবারের সদস্যরা বাসায় ফিরে দেখেন ঘর এলোমেলো এবং গৃহকর্মী নিখোঁজ। বাসার একটি কক্ষ থেকে ৫ ভরি ১০ আনা ওজনের স্বর্ণালংকার, অন্য কক্ষ থেকে আরও ৬ ভরি স্বর্ণ এবং আলমারি থেকে নগদ এক লাখ টাকা চুরি হয়েছে।
পাশের বাসার সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা যায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে ওই নারী বাসায় প্রবেশ করে এবং দুপুর আড়াইটার দিকে একটি পলিথিন ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যায়।
তদন্তে জানা যায়, বিলকিস বেগম পানির সঙ্গে ১০টি চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে ওই দম্পতিকে খাইয়েছিল। অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগের ফলেই আয়শা আক্তারের মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় তার ছেলে বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা (মামলা নং-২৭) দায়ের করেন।
অ্যাডিশনাল ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান আরও বলেন, ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ক্লুলেস। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও আগের মামলার তথ্যভান্ডার (ডেটাবেজ) বিশ্লেষণ করে বিলকিসকে শনাক্ত করা হয়। বিভিন্ন থানার পুরাতন মামলা থেকে তার ছবি সংগ্রহ করে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দেখালে তারা তাকে শনাক্ত করেন। এরপর পিবিআইয়ের একাধিক দল ময়মনসিংহ, জামালপুর ও গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে গাজীপুর চৌরাস্তার আউটপাড়া এলাকা থেকে বিলকিসকে গ্রেফতার করে। পরে সে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বিলকিস বেগম পেশাদার অপরাধী। সে বিভিন্ন ছদ্মনামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মী সেজে চেতনানাশক প্রয়োগ করে চুরি করে আসছিল। খিলক্ষেত, শেরেবাংলা নগর, ভাটারা ও হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। ইতিপূর্বে তিনি গ্রেফতারও হয়েছিলেন।
গ্রেফতার হওয়া অন্য আসামি রবিউল আউয়াল শেরপুর জেলার বাসিন্দা হলেও গাজীপুরে ব্যবসা করত। বিলকিস তার কাছেই চোরাই স্বর্ণ বিক্রি করেছিল বলে সে স্বীকার করেছে। বিলকিসের কাছ থেকে নগদ ৬ হাজার ৩০০ টাকা ও ওষুধের খালি পাতা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ওষুধগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
পিবিআইয়ের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ধারণা করা হচ্ছে গৃহপরিচারিকার ছদ্মবেশে একটি চক্র এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে চোরাই স্বর্ণসহ অন্যান্য মালামাল ক্রয়ের একটি চক্রও জড়িত থাকেত পারে।
গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নাম-ঠিকানা ও এনআইডি যাচাই, মোবাইল নম্বর সংগ্রহ, ছবি সংরক্ষণ এবং স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন পিবিআইয়ের এ কর্মকর্তা।
এর আগে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার শাহজাহান রোডের একটি বাসায় মালাইলা আফরোজ নামে এক নারী ও তার মেয়ে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসা বিনতে আজিজকে কুপিয়ে হত্যা করে গৃহকর্মী আয়েশা অক্তার। ওই বাসা থেকে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় গৃহকর্মী। খুন করার পর ওই বাসা থেকে গোসল করে নাফিসার স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় গৃহকর্মী আয়েশা। পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করে সে।
সময়ের আলো/এআর