রাজধানীর হেয়ার রোডে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন সরকারি বাসভবন। মূলত সরকারপ্রধানের কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সচিবালয়ে যাতায়াতের সুবিধার্থে যমুনাকে তার স্থায়ী আবাসন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নামে বাসা বরাদ্দ দেওয়ার কাজ গতকাল বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করেছে।
বর্তমানে যমুনা ভবনে অবস্থান করছেন সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারি আবাসন পরিদপ্তর জানিয়েছে, আগামীকাল ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি এই ভবনটি ছেড়ে দেবেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী যমুনায় থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বাসা ছাড়ার পর কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শেষে তিনি সেখানে সপরিবারে উঠবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেরেবাংলা নগর বা সংসদ ভবন এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন করার চিন্তা থাকলেও সময়স্বল্পতাসহ বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত যমুনাকেই চূড়ান্ত করা হয়।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী গুলশানে তার নিজস্ব বাসভবনে থাকছেন এবং সেখান থেকেই প্রতিদিন সচিবালয় ও তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন পবিত্র রমজান মাসের ইফতার মাহফিল এবং ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান যমুনাতেই আয়োজন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
যমুনা ভবনের মোট আয়তন প্রায় সোয়া তিন একর। এর পার্শ্ববর্তী ২৪ ও ২৫ নম্বর বাংলো দুটি বর্তমানে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অধীনে থাকলেও, তিনি চলে যাওয়ার পর সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বরাদ্দ থাকবে।
উল্লেখ্য যে, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন গণভবনে ব্যাপক ভাঙচুর হওয়ায় এবং সেটিকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেখানে থাকার আর কোনো সুযোগ নেই।
নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের আবাসনের বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে গত বছরের ৭ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছিল। ছয় সদস্যের এই বিশেষ কমিটির নেতৃত্ব দেন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। দায়িত্ব পাওয়ার পর কমিটি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে এবং গত বছর ২০ জুলাই তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও হেয়ার রোডের ২৪ ও ২৫ নম্বর বাংলোকে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য উপযুক্ত বলে সেই প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এদিকে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকেই হেয়ার রোড, মিন্টো রোড ও বেইলি রোড যা মূলত ‘মন্ত্রিপাড়া’ নামে পরিচিত, সেখানে আবাসনের রদবদল শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার তিনজন সাবেক উপদেষ্টা বাংলো ছাড়েন। আর দুজন সাবেক উপদেষ্টা শিগগির বাসা ছেড়ে দেবেন বলে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরকে জানিয়েছেন।
তবে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মিন্টো রোডের ৩৩ নম্বর বাংলোতেই থাকছেন, কারণ তিনি আগের অন্তর্বর্তী সরকারেও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। আবাসন পরিদপ্তর গতকাল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নামে বরাদ্দের কাজ শেষ করেছে এবং এখন আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হবে। তবে সংস্কারকাজ চলায় মন্ত্রীরা সম্ভবত ঈদুল ফিতরের পর এসব বাসায় উঠতে পারবেন।
আবাসন পরিদপ্তর সূত্রে বরাদ্দের বিস্তারিত তথ্যে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ৩৫ হেয়ার রোড, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ২৪ বেইলি রোড, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ৫ হেয়ার রোড এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনকে ২৫ বেইলি রোডের বাংলো দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদকে ৭ মিন্টো রোড, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুকে ২ মিন্টো রোড, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে ৫ মিন্টো রোড এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে ১ হেয়ার রোডের বাংলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ৬ হেয়ার রোড, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ১ মিন্টো রোড, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ৪ মিন্টো রোড, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ৩৪ মিন্টো রোড এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামকে ৪১ মিন্টো রোডের বাংলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহকে ২ হেয়ার রোড এবং মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খানকে বেইলি রোডে বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে গুলশানে এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ধানমন্ডিতে সরকারি বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীদের জন্য হেয়ার রোডে অবস্থিত দশতলা বিশিষ্ট তিনটি ভবনের সমন্বয়ে গঠিত ‘মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট’-এ ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ভবনে ১০টি করে মোট ৩০টি ফ্ল্যাট রয়েছে।
সময়ের আলো/আরবিএন