বইয়ের প্রতি মুসলিম মনীষীদের অনুরাগ

মাওলানা আমিরুল ইসলাম

ইসলাম

পড়াশোনা, বই, জ্ঞানার্জন মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে অতি পছন্দনীয়। মানবজাতির উদ্দেশে আল্লাহ তায়ালার প্রথম বাণী হলো ‘পড়ো’। বোঝা যায়, জ্ঞানার্জন

2026-02-27T13:00:03+00:00
2026-02-27T13:00:03+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
ইসলাম
বইয়ের প্রতি মুসলিম মনীষীদের অনুরাগ
মাওলানা আমিরুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:০০ পিএম   (ভিজিট : ১৬৯)
সংগৃহীত ছবি
পড়াশোনা, বই, জ্ঞানার্জন মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে অতি পছন্দনীয়। মানবজাতির উদ্দেশে আল্লাহ তায়ালার প্রথম বাণী হলো ‘পড়ো’। বোঝা যায়, জ্ঞানার্জন ব্যতীত আল্লাহর পরিপূর্ণ প্রিয় বান্দা হওয়া যায় না। ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে বইয়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ। ইসলামি জ্ঞান বিস্তারে মুসলমান মনীষী, ইমাম, ফকিহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও গবেষকরা এত পরিমাণ বই লিখেছেন, যার উদাহরণ অন্য কোনো ধর্মে পাওয়া অসম্ভব। ধর্মীয় পুস্তকের আধিক্য মুসলিম জাতির ‘অলৌকিক কীর্তি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, সবকিছুর বিনিময়ে বইয়ের মালিকানা অর্জনের বৈচিত্র্যময় ঘটনায় ভরপুর ইসলামের ইতিহাস। সুদূর অতীত হয়ে বর্তমান সময়েও মুসলিম মনীষীদের বইপ্রীতি ও বই ক্রয়ের আশ্চর্যজনক ঘটনা আমাদের নাড়া দেয় তুমুলভাবে। কিছু ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হলো :

সম্পত্তি বিক্রি করে বই ক্রয় : ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)। ইসলামি ইতিহাসের একজন উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তিনি একবার তার সন্তানকে নসিহত করতে গিয়ে নিজের অভাবগ্রস্ত জীবনের চরম দুর্দশা সম্পর্কে বলেন, ‘শোনো! আমার পিতা অনেক সম্পদশালী ছিলেন। হাজার হাজার দিনার-দিরহাম ও জমিজমা রেখে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর আত্মীয়স্বজন ও মুরুব্বিরা বসে তার রেখে যাওয়া সম্পদ সন্তানদের মধ্যে বণ্টন করেন। আমার ভাগে দুটি বাড়ি ও বিশ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) পড়ে। তারা আমাকে এসব অর্পণ করে বললেন, এই উত্তরাধিকার সম্পদ সব তোমার। আমি গ্রহণ করলাম। প্রাপ্ত সব দিনার দিয়ে কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও বিভিন্ন শাস্ত্রের কিতাবাদি ক্রয় করলাম। বাড়ি দুটিও বিক্রি করে কিতাব ক্রয় ও জ্ঞানার্জনের কাজে ব্যয় করলাম! এরপর আমার হাতে কোনো অর্থকড়ি অবশিষ্ট থাকলো না। আমি পুরোপুরি রিক্তহস্ত হয়ে গেলাম!’

কাপড় বিক্রয় করে কিতাব ক্রয় :  ইমাম আবু জুরয়া রাজি (রহ.)। প্রখ্যাত মুসলিম মনীষী। কুরআন-হাদিসসহ অন্যান্য অনেক শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ। জ্ঞানার্জনে বাড়ি ছেড়ে বের হন। মক্কায় হজ করে মিসরে উপস্থিত হন। সেখানে শাফিয়ি মাজহাবের অনেক কিতাব পাঠে ও বড় আলেমদের সাহচর্যে ধন্য হন। একজন আলেম থেকে কিতাব ক্রয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ তৈরি হলে তিনি প্রস্তাব করেন। কিন্তু ওই আলেম কিতাব বিক্রি করতে রাজি হলেন না। তবে কপি করে দিতে রাজি হলেন। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে চুক্তি সম্পাদিত হলো। অথচ তার কাছে তখন কোনো অর্থ ছিল না। তবে মিসরের বাজার থেকে শখ করে কেনা একটি দামি কাপড় ছিল তার কাছে। কাপড়টি ষাট দিরহামে বিক্রি করে দিলেন! দশ দিরহামে একশটি কাগজ ক্রয় করে ওই ব্যক্তির কাছে সরবরাহ করলেন। এভাবেই তিনি কাপড় বিক্রয়ের বিনিময়ে বিশালসংখ্যক কিতাবের মালিক হয়ে গেলেন।

ডাকাতের সঙ্গে তর্কবিতর্ক : ইমাম গাজালি (রহ.)। জগদ্বিখ্যাত ইসলামি দার্শনিক ও চিন্তবিদ। একবার রাস্তায় ডাকাত দল তাকে আক্রমণ করে সব ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তিনি ডাকাতদের পেছনে পেছনে যেতে লাগলেন। ডাকাত সরদার বলল, দূরে পালাও, আমাদের পিছু ছাড়, নতুবা তোমাকে হত্যা করব! তিনি বললেন, আমার ‘তালিক’ ফেরত দাও। তোমাদের চলাফেরা সহজ হবে। তা ছাড়া ওটাতে তোমাদের কোনো লাভ হবে না! ডাকাত সরদার জিজ্ঞাসা করল, তালিক কী জিনিস? তিনি বললেন, ব্যাগে ভরা আমার বই পুস্তক! এই বইগুলোর শিক্ষা অর্জনের জন্যই আমি ঘর ছেড়েছি। ডাকাত সরদার হেসে বলল, আমরা ছিনিয়ে নেওয়ার পরও তুমি সেগুলো কীভাবে নিজের দাবি করছ? এরপর ডাকাত সরদার বইগুলো ফেরত দিয়ে দিল!

বই শুকাতে শুকাতে চোখ অন্ধ : ইমাম ইবনে দিহান (রহ.)। আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রের বিদগ্ধ আলেম ও বিশ্বজয়ী সাহিত্যিক। আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রে তার নিজের লেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব ছিল। মসুলের সম্ভ্রান্ত ও আলেমপ্রিয় মন্ত্রী জামাল উদ্দিনের ডাকে সাড়া দিতে তিনি বাগদাদ ছেড়ে মসুলে চলে আসেন। নিজের সব বইপত্র বাগদাদে রেখে এসেছিলেন। এমতাবস্থায় প্রবল বন্যায় বাগদাদ শহর ভেসে যায়। তার বাড়ির পেছনে একটি চামড়া শুকানোর উঁচু স্থান ছিল, সেটা টপকে বাড়িতে পানি ঢুকে যায়। বন্যার ফলে তার সব কিতাব নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এই কিতাবগুলো লেখা ও সংগ্রহের পেছনে তার সারা জীবন ব্যয় হয়েছে! কিছু কিতাব উদ্ধার করে তার কাছে উপস্থাপন করা হলে লোকেরা আটা জাতীয় এক ধরনের ধূপ জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিতে পরামর্শ দিলেন। যাতে হালকা আগুন ও ধোঁয়ার মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব বইপত্র সংরক্ষণ করা যায়। তিনি একাধারে ৩০ মাসেরও বেশি সময় ধূপ জ্বালিয়ে বইগুলো রক্ষণের চেষ্টা করেছেন। ফলে তার মাথা ও চক্ষু আটার আবরণে আক্রান্ত হয়। তিনি অন্ধ হয়ে যান! বইয়ের নেশায় এতটাই কাতর ছিলেন যে, চক্ষু অন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অথচ সেদিকে মোটেও ভ্রক্ষেপ নেই।

/এমএইচআর 



  বিষয়:   বই  মুসলিম  মনীষী 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: