ইশরাকের নামাজে ওমরাহর সওয়াব

মাওলানা আবদুল হালিম

ইসলাম

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলো একজন মুমিনের পরিচয় ও ঈমানের প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু শুধু ফরজ আমলই কি যথেষ্ট?

2026-07-20T11:46:55+00:00
2026-07-20T11:46:55+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
ইশরাকের নামাজে ওমরাহর সওয়াব
মাওলানা আবদুল হালিম
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলো একজন মুমিনের পরিচয় ও ঈমানের প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু শুধু ফরজ আমলই কি যথেষ্ট? একজন মুমিনের জীবনের লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান লাভ করা। আর এই লক্ষ্য অর্জনে ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল ইবাদত বা অতিরিক্ত আমলের গুরুত্ব অসামান্য। ফরজ ইবাদতগুলো হলো ইমারতের দেয়ালের মতো, আর নফল ইবাদতগুলো হলো সেই ইমারতের অলংকার ও সৌন্দর্য। 

এই নফল ইবাদতগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং অত্যন্ত বরকতময় একটি আমল হলো ‘সালাতুল ইশরাক’ বা সূর্যোদয়ের পর মুহূর্তের নামাজ। আরবিতে সূর্যোদয়ের সময়কে বলে ‘ইশরাক’। সালাতুল ইশরাক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত, যা একজন বান্দাকে সরাসরি তার রবের কাছাকাছি পৌঁছে দেয়।

ইশরাকের নামাজের গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু ফরজ নামাজের প্রতিই গুরুত্ব দিতেন না, বরং উম্মতকে নফল ইবাদতেও উৎসাহ দিতেন। বিশেষ করে সালাতুল ইশরাকের ক্ষেত্রে তিনি নিজে তো আমল করতেনই, সাহাবায়ে কেরামকেও এর প্রতি বিশেষ তাগিদ দিতেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি আমাদের জন্য অনেক বড় শিক্ষণীয়। তিনি বলেন, ‘প্রিয়নবী (সা.) আমাকে তিনটি জিনিসের অসিয়ত বা আদেশ করেছেন, যা আমি মৃত্যু পর্যন্ত কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারি না। বিষয়গুলো হচ্ছে- প্রতি মাসে কমপক্ষে তিন দিন রোজা রাখা, ঘুমানোর আগে বিতর নামাজ আদায় করা এবং সফরে বা নিজ এলাকায় যখন যেখানে থাকি, নিয়মিত সালাতুল ইশরাক আদায় করা’ (বুখারি : ২৫৬)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সালাতুল ইশরাক কোনো সাধারণ নফল নামাজ নয়, বরং এটি নবীজি (সা.)-এর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য এক বিশেষ উপহার।

কৃতজ্ঞতা আদায়ের মাধ্যম
আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি মুহূর্তে অগণিত নেয়ামত দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর রহমত ও অনুগ্রহের সাগরে আমরা নিমজ্জিত। সুস্থ দেহ, সুন্দর মস্তিষ্ক, অন্ন-বস্ত্র এবং বেঁচে থাকার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক একটি নেয়ামত। এই বিশাল নেয়ামত রাশির কৃতজ্ঞতা আদায় করা আমাদের পক্ষে কি সম্ভব? 

কিছুতেই না। এই বিষয়টিই এক হাদিসে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠে, তখন তার প্রতিটি অস্থি-গ্রন্থির ওপর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের পক্ষে তা পৃথকভাবে আদায় করা সম্ভব নয়। তাই সে যদি দুই রাকাত সালাতুল ইশরাক আদায় করে তা হলে তার ওপর থেকে সব গ্রন্থির কৃতজ্ঞতা আদায়ের দায়িত্ব পালন হয়ে যায়’ (আবু দাউদ : ৫২৪৩)। অর্থাৎ সারা দিনের ইবাদত ও শুকরিয়ার একটি সংক্ষিপ্ত অথচ কার্যকরী রূপ হলো এই ইশরাকের নামাজ।

অদৃশ্য নিরাপত্তা ও জান্নাতের প্রতিশ্রুতি
আমরা যদি আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের খাতায় নিজেদের নাম লেখাতে চাই, তবে ইশরাকের নামাজ হতে পারে আমাদের অন্যতম মাধ্যম। কারণ এটি আল্লাহর প্রিয় নামাজ। এই নামাজ আদায়কারীদের জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রাতঃকালে বারো রাকাত সালাতুল ইশরাক আদায় করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতে একটি স্বর্ণ ও রৌপ্য খচিত প্রাসাদ নির্মাণ করবেন’ (তিরমিজি : ৪৪৩)। 

যদিও এই মর্যাদাটি বড় আমলের জন্য নির্দিষ্ট, তবে ছোট আকারে শুরু করলেও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ নেই। সালাতুল ইশরাকের আরেকটি অসাধারণ ফজিলত হলো এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া অদৃশ্য নিরাপত্তা। দিনের শুরুতে এই নামাজ আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে দিনের শেষ পর্যন্ত যাবতীয় অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেন। 

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘হে আদম সন্তান! দিবসের সূচনায় তুমি আমার জন্য চার রাকাত সালাতুল ইশরাক আদায় করো, আমি তোমার দিনের সমাপ্তি পর্যন্ত তোমাকে যাবতীয় অশুভ শক্তি, পথের দুর্ঘটনা ও যাবতীয় অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব নেব’ (ইবনে হিব্বান : ২৫৩৩)। সুবহানআল্লাহ! মহান রবের পক্ষ থেকে এমন নিরাপত্তার ঘোষণার পরও আমরা কি সালাতুল ইশরাক থেকে পিছিয়ে থাকতে পারি?

হজ ও ওমরাহর সমতুল্য সওয়াব
সালাতুল ইশরাকের ফজিলত বর্ণনায় আরেকটি চমৎকার হাদিস রয়েছে, যা আমাদের ঈমানকে উদ্দীপ্ত করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করবে, অতঃপর আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকবে সূর্য উঠা পর্যন্ত, তারপর দুই রাকাত সালাতুল ইশরাক আদায় করবে, তার জন্য থাকবে একটি পূর্ণ হজ এবং পরিপূর্ণ ওমরাহর সমপরিমাণ প্রতিদান’ (তিরমিজি : ২৭৯)। যারা শারীরিক অসুস্থতা বা আর্থিক অভাবের কারণে হজ করতে পারছেন না, তাদের জন্য এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কত বড় রহমত! মাত্র দুই রাকাত নামাজে হজ-ওমরাহর সওয়াব লাভের সুযোগ আর কোথায় পাওয়া যাবে?

আমলের নিয়ম ও সময়সীমা
সালাতুল ইশরাক পড়া সুন্নত। এর সময় শুরু হয় সূর্য পরিপূর্ণভাবে উদিত হওয়ার পর। সাধারণত সূর্যোদয়ের ১৫ থেকে ২০ মিনিট পার হলে ইশরাকের সময় শুরু হয়। সালাতুল ইশরাকের নিয়ম-কানুন অন্যান্য নফল নামাজের মতোই। এটি দুই রাকাত দুই রাকাত করে পড়তে হয়। আপনি চাইলে দুই রাকাত, চার রাকাত বা তার চেয়ে বেশিও পড়তে পারেন। নামাজের কোনো ধরাবাঁধা সীমা নেই, তবে রাসুল (সা.) যেভাবে উৎসাহিত করেছেন, সেই অনুযায়ী আমল করা উত্তম।

আমরা যদি চাই হজের সমান সওয়াব লাভ করতে, চাই একটি নিরাপদ ও প্রশান্তিময় জীবনযাপন করতে এবং হতে চাই আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা তা হলে সালাতুল ইশরাকের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের প্রতিটি মানুষের উচিত, নিজের দৈনন্দিন রুটিনে ইশরাকের এই নামাজকে অন্তর্ভুক্ত করা। এটি কেবল একটি নামাজ নয়, বরং এটি হলো দিনের শুরুতেই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পা বাড়ানো। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নিয়মিত আদায়ের তওফিক দান করুন।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   ইশরাকের নামাজ  ওমরাহ  সওয়াব  ইসলাম 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: