ইসলামের ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি কেবল একটি রাজনৈতিক চুক্তি বা সাময়িক সমঝোতা নয়, বরং এটি ছিল এক সুদূরপ্রসারী আত্মিক ও কৌশলগত বিপ্লব। মক্কা বিজয়ের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এই সন্ধি এমন এক মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়, যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে কিছুটা প্রতিকূল ও অবমাননাকর মনে হলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে ছিল ইসলামের সুমহান বিজয়ের চাবিকাঠি। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে কাবাঘরের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত থাকা এবং কুরাইশদের বাধার মুখে পড়া মুসলমানদের মনে এক গভীর বিরহ ও আকুলতা তৈরি করেছিল। সেই পবিত্র আকুতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি স্বপ্নের মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে চৌদ্দশ সাহাবির ঐতিহাসিক মক্কা যাত্রার পথ সুগম করে। হুদায়বিয়ার প্রান্তরে দাঁড়িয়ে সাহাবায়ে কেরামের অটল আনুগত্য, ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’-এর রক্তিম শপথ এবং নবুয়তি প্রজ্ঞার অপূর্ব সমন্বয়ে রচিত সন্ধিপত্রটি আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপট চিরতরে বদলে দিয়েছিল। নগদ প্রাপ্তির মোহ ছাড়িয়ে সুদূর দূরান্তের কৌশলগত সুফল অর্জনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সন্ধি ইসলামকে আরব জাহানে এক অপ্রতিরোধ্য ও স্বীকৃত শক্তিতে পরিণত করেছিল।
ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে নবীজি (সা.) স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে পবিত্র মক্কা নগরীতে গিয়ে ওমরাহ আদায় করেছেন। নবীদের স্বপ্ন তো নিছক স্বপ্ন নয়। তা মহান আল্লাহ তায়ালার নীরব নির্দেশনা। এ নির্দেশনা পালনের অভিপ্রায়ে তিনি তৎপর হয়ে ওঠেন। আমভাবে সবার মাঝে ওমরাহ আদায়ের ঘোষণা করে দেন। সাহাবায়ে কেরামও আল্লাহর নির্দেশ পালন আর নবীর সাহচর্য অর্জনের মানসে প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। চৌদ্দশ সাহাবি সঙ্গে নিয়ে নবীজি (সা.) মক্কার দিকে যাত্রা করেন। নবীজি (সা.) মক্কার কাছাকাছি এক জায়গায় গিয়ে থামলেন। সেখান থেকে একজন লোক পাঠালেন মক্কার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য। তিনি এসে জানালেন, কুরাইশ নেতারা বিশাল এক বহর নিয়ে মুসলমানদের বাধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। নবীজি (সা.) পথ পরিবর্তন করে হুদায়বিয়ায় গেলেন। সেখান থেকে একজন দূত মারফত কুরাইশের কাছে সংবাদ পাঠালেন যে, আমরা স্রেফ ওমরাহ আদায় করার জন্য এখানে এসেছি। লড়াই করার আদৌ কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। সবচেয়ে ভালো হয়, কিছু সময়ের জন্য কুরাইশ নেতারা আমাদের সঙ্গে সন্ধি করুক। পুরো আরবের সঙ্গে কী করতে হয় তা আমরা পরে দেখব।
দূত কুরাইশ নেতাদের কাছে গিয়ে এ পয়গাম শোনান। এ পয়গাম শুনে কুরাইশ নেতারা কিছুটা দোটানায় পড়ে যায়। তাদের পক্ষ থেকে উরওয়া বিন মাসউদ নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে কথা বলতে আসেন। সেখানে এসে মুসলমানদের আত্মিক বিপ্লবের এক বিস্ময়কর চিত্র দেখতে পান তিনি। হজরতের প্রতি সাহাবিদের ভক্তি ও ভালোবাসার যে পরাকাষ্ঠা তিনি দেখতে পান, তাতে তার চিন্তার জগৎ এলোমেলো হয়ে পড়ে। নবীজি (সা.)-কে তিনি মক্কায় প্রবেশের সংকল্প পরিহার করতে বলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, আমরা লড়াই করার উদ্দেশ্যে এখানে আসিনি। বায়তুল্লাহ জিয়ারতের মাধ্যমে একটি ধর্মীয় কর্তব্য পালন করার জন্য এসেছি। উরওয়া কুরাইশের কাছে ফিরে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেন, আমি কিসরা, কায়সার ও নাজাশির দরবার দেখেছি। ভক্তি ও ভালোবাসার এমন নিখাদ চিত্র আর কোথাও আমার চোখে পড়েনি। মুহাম্মদ কথা বলা শুরু করলে চারদিকে নীরবতা ছেয়ে যায়। ভক্তির আতিশয্যে কেউ তাঁর দিকে চোখ তুলে পর্যন্ত তাকায় না। ওজু করার সময় পানির যে ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে, প্রেমাকুল ভক্তরা তা লুফে নিয়ে চোখে-মুখে মাখতে থাকে। এখন চিন্তা করে দেখো, তোমরা কার মোকাবিলা করতে যাচ্ছ?
এরপর নবীজি (সা.) উসমান (রা.)-কে দূত বানিয়ে কুরাইশদের কাছে পাঠান। উসমান (রা.) তাদের কাছে নবীজি (সা.)-এর অভিপ্রায় পুনরায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা বায়তুল্লাহর তওয়াফ ও কুরবানি করে ফিরে যাব। কুরাইশের লোকজন আগের মতোই গোঁ ধরে থাকে। এবার তারা উল্টো উসমান (রা.)-কে আটক করে। এ সময় মুসলিমদের মাঝে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, উসমান (রা.)-কে হত্যা করা হয়েছে। দূত হত্যার খবরের পর যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া মুসলমানদের জন্য আর কোনো উপায় থাকে না। রাসুল (সা.) সব সাহাবিকে একত্রিত করলেন এবং তাদের কাছ থেকে এ মর্মে বায়াত গ্রহণ করলেন যে, আমরা এখান থেকে আমৃত্যু পিছু হটব না। পুরো কাফেলার সবাই নবীজি (সা.)-এর হাতে হাত রেখে জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধাহীন চিত্তে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তাদের নিষ্ঠাপূর্ণ ঈমান এবং আল্লাহর পথে নিবেদিত প্রাণ হওয়ার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? এটিই ইসলামের ইতিহাসে ‘বায়াতে রিদওয়ান’ নামে খ্যাত। মুসলমানদের এই বায়াতের কথা শুনতে পেরে কুরাইশরা ভড়কে যায়। নবীজি (সা.) এবং সাহাবিদের আদৌ মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না— কুরাইশরা তাদের এ জেদ ও একগুঁয়েমি পরিত্যাগ করে। তবে নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য তারা নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় যেতে সম্মত হয়।
এরপর দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর যেসব শর্তের ভিত্তিতে বোঝাপড়া তথা সন্ধিপত্র লেখা হয় তা হচ্ছে— ১. উভয়পক্ষের মধ্যে দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ থাকবে এবং একপক্ষ অপরপক্ষের বিরুদ্ধে গোপনে বা প্রকাশ্যে কোনো তাৎপরতা চালাবে না। ২. এ সময়ে কুরাইশদের কেউ তার অভিভাকবের অনুমতি ছাড়া পালিয়ে মুহাম্মদের কাছে চলে গেলে তিনি তাকে ফেরত দেবেন। কিন্তু মুসলমানদের কেউ কুরাইশদের কাছে চলে গেলে তারা তাকে ফেরত পাঠাবে না। ৩. যেকোনো আরব গোত্র যেকোনো পক্ষের মিত্র হয়ে এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে তার সে অধিকার থাকবে। ৪. মুহাম্মদ (সা.) এ বছর ফিরে যাবেন এবং আগামী বছর ওমরাহর জন্য এসে মক্কায় তিন দিন অবস্থান করতে পারবেন। তবে শর্ত হচ্ছে, শুধু একটা করে তরবারি ছাড়া আর কোনো যুদ্ধ সরঞ্জাম সঙ্গে আনতে পারবেন না। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় এখানকার কোনো অধিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি তাঁর থাকবে না।
সন্ধির শর্তগুলো দেখে মুসলিম কাফেলা সবাই অত্যন্ত বিচলিত বোধ করছিলেন। কুরাইশ কাফেররা একে তাদের সফলতা মনে করেছিল আর মুসলমানরা বিচলিত হচ্ছিলেন এই ভেবে যে, তারা নিচু হয়ে এ অবমাননাকর শর্তাবলি গ্রহণ করবেন কেন? এমনকি শর্তাবলি দেখে ওমর (রা.) বেশ অস্থির হয়ে ওঠেন। তিনি নবীজি (সা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, ‘তিনি কি আল্লাহর রাসুল নন? আমরা কি মুসলমান নই? এসব লোক কি মুশরিক নয়? এসব সত্ত্বেও আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এ অবমাননা মেনে নেব কেন?’ নবীজি (সা.) জবাব দিলেন, ‘হে ওমর! আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলকে কখনো ধ্বংস করবেন না।’ শুধু শত্রুকে পরাভূত করা আর নগদ প্রাপ্তির মাধ্যমেই বিজয় নির্ধারিত হয় না। বিজয়ের নানা রূপ আছে। প্রতিপক্ষের কাছে নিজেকে অনিবার্য করে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের অকেজো করে তোলাও বিজয়। শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে নিজের দলে ভেড়ানোও বিজয়ের একটা রূপ।
হুদায়বিয়া সন্ধির মাধ্যমে নবীজি (সা.)-এর সামনে বর্ণাঢ্য বিজয়ের এই দুয়ার উন্মোচিত হয়। যেমন— ১. এ চুক্তির মাধ্যমে আরবে প্রথমবারের মতো ইসলামি শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অথচ এর আগপর্যন্ত নবী (সা.) ও সাহাবিদের ধর্মদ্রোহী ও বিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে সমাজচ্যুত মনে করা হতো। ২. কুরাইশরা এ যাবৎ ইসলামকে ধর্মহীনতা বলে আখ্যায়িত করে আসছিল। কিন্তু মুসলমানদের জন্য বায়তুল্লাহ জিয়ারতের অধিকার মেনে নিয়ে তারা যেন এ কথাও মেনে নিল, ইসলাম কোনো ধর্মহীনতা নয়; বরং আরবে স্বীকৃত ধর্মগুলোর একটি এবং অন্যান্য আরবের মতো এ ধর্মের অনুসারীরাও হজ ও ওমরাহ পালনের অধিকার রাখে। কুরাইশদের অপপ্রচারের ফলে আরবের মানুষের মনে ইসলামের বিরুদ্ধে যে ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিল এতে সে ঘৃণাও অনেকটা হ্রাস পায়। ৩. দশ বছরের জন্য যুদ্ধ বিরতি চুক্তি হওয়ার ফলে মুসলমানরা নিরাপত্তা ও স্বস্তি লাভ করেন এবং আরবের আনাচে-কানাচে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তারা দ্রুত ইসলামের প্রচার শুরু করেন। আরবের সাধারণ লোকজনও স্বাধীনভাবে তাদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায়। তারা ভেতর থেকে ইসলামকে জানতে পারে। ইসলামের সৌন্দর্য, মানবিকতা ও শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করতে পারে। ফলে দুই বছরের মাথায় কুরাইশদের চুক্তিভঙ্গের ফলে নবী (সা.) যখন মক্কায় অভিযান চালান তখন দশ হাজার সৈনিকের এক বিশাল বাহিনী তাঁর সঙ্গে ছিল। ৪. কুরাইশদের পক্ষে থেকে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নবীজি (সা.) তাঁর অধিকারভুক্ত এলাকায় ইসলামি অনুশাসন ও আইন-কানুন চালু করে মুসলিম সমাজকে একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে দাঁড় করানোর সুযোগ লাভ করেন।
এটিই সেই মহান নেয়ামত যে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের জন্য আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের দ্বীন হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করলাম।’ ৫. কুরাইশদের সঙ্গে সন্ধি হয়ে যাওয়ার তিন মাস পরেই ইহুদিদের সবচেয়ে বড় দুর্গ খায়বার বিজিত হয় এবং একের পর এক ইহুদিদের অন্যান্য জনপদও মুসলমানদের অধীনে আসে। মধ্য আরবের যেসব গোত্র ইহুদি ও কুরাইশদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিল তার সবই এক এক করে মুসলমানদের শাসনাধীন হয়ে পড়ে। হুদাইবিয়ার সন্ধি এভাবে মাত্র দুই বছরের মধ্যে আরবে শক্তির ভারসাম্য এতটা পাল্টে দেয় যে, কুরাইশ এবং মুশরিকদের শক্তি অবদমিত হয়ে পড়ে এবং ইসলামের বিজয় নিশ্চিত হয়ে যায়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি