সম্পত্তি দান করেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ব্যবহার ও ভোগের অধিকার পাবেন— এমন বিধান রেখে গত রোববার সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী নিয়ে আপত্তি তুলেছেন আলেমরা।
তারা বলছেন, ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ শীর্ষক এই সংশোধনী কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে হেফাজতে ইসলাম থেকে শুরু করে কওমি ধারার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সংশোধনী বাতিলের দাবিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব আলেমদের একটি বড় অংশ।
বিলটিতে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা পিতামহ/মাতামহ কর্তৃক তার সন্তান বা নাতি-নাতনিকে অথবা বিপরীতক্রমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভোগাধিকার থাকবে এবং আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে।
এই সংশোধনীর বিপরীতে পবিত্র কুরআনের সুরা নিসায় মৃতের সম্পদ বণ্টনের বিধিমালার বিষয়টি সামনে আনছেন আলেমরা। সুরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে ওয়ারিশদের অংশ সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘এটা আল্লাহর সীমানা।’ ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর অবাধ্য হবে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব আলেমদের একটি বড় অংশের বক্তব্য হচ্ছে, ইসলাম যেহেতু ওয়ারিশদের সম্পত্তি সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে, তাই এখানে পছন্দের এক সন্তান বা ওয়ারিশকে সব সম্পত্তি লিখে দেওয়ার সুযোগ নেই।
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা করার শরয়ি বিধান’ বিষয়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেকের কাছে ফতোয়া চেয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেনের সহকারী একান্ত সচিব মো. আশিকুল ইসলাম। ওই মাসের ৫ তারিখে এ বিষয়ে বিস্তারিত ফতোয়া দেন মুফতি আবদুল মালেক।
ফতোয়ার শেষ পৃষ্ঠায় তিনি বলেন, ‘মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কোনো ধরনের সংশোধন ও পরিবর্তনের ন্যূনতম অবকাশ নেই। জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা করা ইসলামি শরিয়তে জায়েজ নেই। হেবাকৃত সম্পদের দখল হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত কেউ একা ওই সম্পদের পূর্ণ মালিক হতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে সম্পদ মিরাস বণ্টননীতি অনুযায়ী সব ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টন করা আবশ্যক।
অন্যদিকে যদি হেবার বস্তুর দখল হস্তান্তর সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে হেবাকারীর মালিকানা থেকে বাদ পড়ে হেবাগ্রহীতার মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দখল হস্তান্তরের পর দাতার জীবদ্দশায় হেবাগ্রহীতা ওই সম্পদ ভোগ করার দাবি করতে পারবে না— এমন শর্ত যুক্ত করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিল ও অর্থহীন।’
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী পাসের প্রতিক্রিয়ায় বিদ্যমান মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার কোনো ব্যত্যয় না ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান এক যৌথ বিবৃতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন কোনো পদ্ধতি বা ধারা যেন ইসলামি উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয় তা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন।
ইসলাম আন্দোলনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আইনটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এটি শরিয়া পরিপন্থী। এর মধ্যে জটিলতা আছে। জটিলতা নিয়ে কোনো আইন হতে পারে না।’ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘মা-বাবার নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহ তায়ালা নির্ধারিত হেবা, অসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের এই নতুন বিধানটি শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও