একজন অতিথি কখনো শুধু একজন মানুষ নন; তিনি হতে পারেন ঘরে আসা আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। তাই অতিথিকে সম্মান করা এবং সাধ্য অনুযায়ী আপ্যায়ন করা ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদার কাজ। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) অতিথির প্রতি ভালো আচরণকে মুমিনের ইমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে অতিথি আপ্যায়নের গুরুত্ব কতটা। অতিথিকে সম্মান করা শুধু সামাজিক রীতি নয়, এটি ইমানেরও একটি প্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে অতিথি আপ্যায়নের এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও মানুষকে আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়।
একদিন এক ক্ষুধার্ত ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলেন। তাঁর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে নবীজি (সা.) নিজের ঘরে খোঁজ নিলেন। কিন্তু সেখানে পানি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
তখন তিনি সাহাবিদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আজ রাতে কে এই মেহমানকে আপ্যায়ন করবে?’
এক আনসারি সাহাবি সঙ্গে সঙ্গে অতিথিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়িতে পৌঁছে তিনি স্ত্রীকে বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অতিথিকে যেন যথাসাধ্য সম্মান করা হয়।
স্ত্রী তখন জানালেন, ঘরে শুধু সন্তানদের জন্য সামান্য খাবার রয়েছে। অতিথির জন্য আলাদা করে কিছু নেই।
সাহাবি তখন একটি উপায় বের করলেন। তিনি স্ত্রীকে বললেন, সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিতে। এরপর খাবার অতিথির সামনে পরিবেশন করতে। আলো নিভিয়ে দিতে হবে, যাতে অন্ধকারে তাঁরা খাচ্ছেন—এমন মনে হয়।
স্ত্রী স্বামীর কথা অনুযায়ী সব করলেন। বাতি নিভে গেলে তাঁরা দুজন খাবারের পাত্রে হাত নাড়াচাড়া করে খাওয়ার ভান করতে লাগলেন। অথচ তাঁদের সামনে কোনো খাবার ছিল না।
অতিথি যেন স্বাচ্ছন্দ্যে খেতে পারেন, সে জন্য নিজেদের এবং সন্তানদের খাবারটুকুও তাঁরা তাঁর সামনে তুলে দিয়েছিলেন। অতিথিকে তৃপ্ত করে সেই পরিবারটি নিজেরা না খেয়েই রাত কাটিয়ে দিল।
পরদিন সকালে ওই সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলে নবীজি (সা.) মুচকি হেসে তাঁকে জানালেন, আগের রাতে অতিথির জন্য তাঁদের এই ত্যাগে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন।
তাঁদের এই আত্মত্যাগের ঘটনা কোরআনের আয়াতেও তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও অন্যদের নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৯; বুখারি, হাদিস: ৩৭৯৮)
এই ঘটনা শুধু অতিথি আপ্যায়নের শিক্ষা দেয় না, বরং অন্যকে নিজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মহান আদর্শ সামনে তুলে ধরে। নিজের অভাবের মধ্যেও অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া ইসলামের অন্যতম সুন্দর শিক্ষা।
তাই সামর্থ্য যতটুকুই হোক, অতিথিকে সম্মান করা, তার প্রয়োজনের প্রতি খেয়াল রাখা এবং আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করা উচিত। কারণ ইসলামে অতিথির সম্মান শুধু সৌজন্য নয়, এটি ইমানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সময়ের আলো/এসএকে