মানুষের মনের ভাব প্রকাশের শক্তিশালী একটি মাধ্যম কবিতা। অনুভূতি, চিন্তা ও বিশ্বাসকে শব্দের সৌন্দর্যে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ায় কবিতার ধর্ম। তাই ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো কোনো সময় তলোয়ারের চেয়েও একটি কবিতা, মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তেমনি এক প্রভাবের গল্প শোনা যাক।
প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। সে সময়েও আরব সমাজে ছিল কবিতার চর্চা। সেই সময় ছিল গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও আধিপত্যের লড়াইয়ে ভরা। ওই সমেয় লড়াই হতো দুভাবে। হাতে তলোয়ার এর মুখে কবিতা। বিভিন্ন মত ও অবস্থানের পক্ষে-বিপক্ষে কবিতার বহাস হতো।
ইসলামের শুরুর যুগেও কবিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ের একটি ঘটনা বলা যায়।
অষ্টম হিজরি সনের ঘটনা। আরবের বিখ্যাত কবি ছিলেন কা‘ব ইবনে জুহাইর। তার বাবাও ছিলেন বিখ্যাত কবি। তখনো কা‘ব ইসলাম গ্রহণ করেননি। বরং তিনি ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ব্যঙ্গ করে কবিতা লিখতেন।
একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন তার সামনে পালিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। এদিকে মক্কা ও মদিনায় মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে যায়। এর মধ্যেই তার ভাই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিও ছিলেন কবি।
ভাইয়ের কাছ থেকে ইসলামের কথা শুনে কা‘ব নিজের ভুল বুঝতে পারেন। এরপর তিনি মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সেখানে তিনি নিজের বিখ্যাত কাসিদা ‘বনাত সু‘আদ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন।
কবিতাটিতে কা‘ব (রা.) অকপটে নিজের অনুতাপের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসা করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল এমন এক নূর, যার মাধ্যমে মানুষ আলোর পথ খুঁজে পায়।
কা‘ব (রা.)-এর কবিতা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তুষ্ট হন। কবিতা আবৃত্তি শেষ হলে তিনি নিজের পরনের চাদর খুলে কা‘ব (রা.)-কে উপহার দেন।
এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় কা‘ব (রা.)-এর কাসিদাটি পরবর্তীকালে ‘কাসিদায়ে বুরদা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ‘বুরদা’ অর্থ চাদর। তাই এটি ‘চাদরের কবিতা’ নামেও পরিচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্য, ন্যায়, সৌন্দর্য ও ইসলামের পক্ষে থাকা কবিতাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার যুগের আরেকজন বিখ্যাত কবি ছিলেন হাসসান ইবনে সাবিত (রা.)। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
হাসসান (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসা করে কবিতা লিখতেন। মুশরিক কবিরা যখন ইসলাম ও নবীজি (সা.)-কে ব্যঙ্গ করে কবিতা রচনা করতেন, তখন হাসসান (রা.) কবিতার মাধ্যমেই তার কড়া জবাব দিতেন।
সহিহ মুসলিমে তার প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সমর্থনের একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার নবীজি (সা.) হাসসান (রা.)-কে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কবিতা রচনার অনুমতি দেন। তিনি বলেন, ‘তুমি তাদের জবাব দাও, জিবরাইল তোমার সঙ্গে আছেন।’
শুধু অনুমতি দিয়েই থেমে থাকেননি নবীজি (সা.)। তিনি হাসসান (রা.)-কে কবিতার মাধ্যমে ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করতেন।
হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি জানান, রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে হাসসান (রা.)-এর জন্য একটি মিম্বর স্থাপন করে দিতেন। সেখানে দাঁড়িয়ে হাসসান (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসা করতেন এবং তাঁর পক্ষে কবিতা আবৃত্তি করতেন।
নবীজি (সা.) বলতেন, হাসসান যতক্ষণ আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে জবাব দিতে থাকেন, ততক্ষণ আল্লাহ তাঁকে ‘রুহুল কুদুস’ তথা পবিত্র আত্মার মাধ্যমে সাহায্য করেন।
হাসসান (রা.)-এর কবিতা সে সময় শুধু সাহিত্যচর্চা ছিল না। ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপপ্রচারের জবাব দিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ কারণে তাঁর কবিতাকে ইসলামের পক্ষে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ হিসেবেও দেখা যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব ধরনের কবিতাই নবীজি (সা.) পছন্দ করতেন বা সমর্থন করেছেন। তাঁর যুগের ঘটনাগুলো থেকে বরং বোঝা যায়, কবিতার মূল্যায়ন করা হতো এর বক্তব্য ও উদ্দেশ্য দিয়ে।
যে কবিতায় সত্য, ন্যায়, শালীনতা ও সুন্দর বার্তা থাকে, তা মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অন্যায়, অশ্লীলতা বা বিদ্বেষ ছড়ানো কবিতা মানুষের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।
তাই মহানবী (সা.)-এর কবিতা-সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। শিল্প ও সাহিত্য শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পক্ষে এগুলোকে কাজে লাগানো যায়। মানুষের হৃদয় ও চিন্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেও কবিতা ও সাহিত্য শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।
সময়ের আলো/এসএকে