আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তাদের যথাযথ আকৃতি ও অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতিও এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নয়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে’ (সুরা ত্বিন : ৪)। বস্তু ও প্রাণিজগতের আকার-আকৃতি, চলন-বলন, শারীরিক গঠন এবং অঙ্গভঙ্গির সবকিছুই উৎকৃষ্টতার বিচারে অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। এই নিখুঁত সূক্ষ্মতাগুলো মানুষের সাধারণ বিচার-বিবেচনা ও সীমিত গবেষণার আয়ত্বের বাইরে থাকায় অনেকেই আল্লাহর এই অসীম কুদরত ও ক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি আল্লাহর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মানুষ মানব ও পশুদেহে নানা ধরনের কৃত্রিম পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। অথচ চিকিৎসাশাস্ত্রের দৃষ্টিতেও যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক দৈহিক পরিবর্তন অস্বস্তি, মানসিক অবসাদ ও নানা ধরনের রোগব্যাধি ছাড়া ভালো কিছু বয়ে আনে না।
পবিত্র কুরআনের সুরা নিসার ১১৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, শয়তান আল্লাহর দরবারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সে মানুষকে প্ররোচিত করে আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি ঘটাবে। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে শয়তানের সেই প্ররোচনার বাস্তব প্রতিফলন অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে লক্ষ করা যায়। আজ অনেকেই শখের বশে শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা, নান্দনিক প্লাস্টিক সার্জারি এবং ট্র্যান্সহিউম্যানিজমের মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দৈহিক পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্টতই নিষিদ্ধ ও অত্যন্ত গর্হিত একটি অপরাধ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, নবীজি (সা.) মানবদেহে উল্কি অঙ্কন বা ট্যাটু আঁকতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন (সহিহ বুখারি : ৫৪০৮)। সাধারণ মুসলিম সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ বিষয়ে পর্যাপ্ত দ্বীনি জ্ঞান না থাকার কারণে অজান্তেই এমন গর্হিত কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। সামান্য বাহ্যিক ফ্যাশনের মোহে পড়ে তারা চেহারা ও শরীরের স্বাভাবিক ও সুস্থ গঠনকে কৃত্রিম উপায়ে পরিবর্তন করছেন। আল্লাহ প্রদত্ত এই সুন্দর মানবদেহে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম পরিবর্তন শুধু আল্লাহর সৃষ্টির অবমাননাই নয়, বরং সরাসরি তাঁর অসীম কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রতি এক ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার শামিল।
আধুনিক প্রযুক্তির অতি সহজলভ্যতা এবং পার্থিব অন্ধ প্রতিযোগিতার মুখে মানবজাতি আজ আল্লাহর নির্ধারণ করা সৃষ্টির স্বাভাবিক রূপকে বিকৃত করছে। এর মধ্যে ট্রান্সহিউম্যানিজমের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষকে কৃত্রিম উপায়ে অমর করে তোলা এবং মানুষের মস্তিষ্কের ওপর প্রযুক্তির পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করা; অথচ জীবন ও মৃত্যুর এই পরম ক্ষমতা কেবলই মহান আল্লাহর একচ্ছত্র এখতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত। মূলত আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রতি গভীর অসন্তুষ্টি ও আস্থাহীনতা থেকেই মানুষ এ ধরনের ক্ষতিকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা একজন মুমিনের জন্য স্পষ্ট নাফরমানি ও গুনাহের কাজ। আল্লাহ তায়ালা সুরা আল-ইমরানের ৬ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদের আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান।’ অর্থাৎ আমাদের দেহের বাহ্যিক আকৃতি, গায়ের রং ও উচ্চতা সবকিছুই আল্লাহর অন্তহীন প্রজ্ঞা ও অমোঘ সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এতে অন্যায়ভাবে কোনো পরিবর্তন আনা মানেই মূলত আল্লাহর পরম সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা।
এই সুন্দর পৃথিবীতে আমাদের পাঠানোর মূল ও একমাত্র উদ্দেশ্য হলো— একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কিন্তু মানুষ আজ তার প্রকৃত ও অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে এসব অবাস্তব ও ক্ষতিকর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। ক্ষণস্থায়ী বাহ্যিক সৌন্দর্যের কৃত্রিম মোহে মগ্ন হয়ে মানুষ ভুলে যাচ্ছে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে অর্পিত গুরুদায়িত্ব এবং পরকালের অফুরন্ত জান্নাতের সুমহান অনুগ্রহের কথা। পরিশেষে বলা যায়, চিকিৎসাজনিত কোনো জরুরি ও যৌক্তিক প্রয়োজন ছাড়া কেবল সাময়িক সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে মানবদেহে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ।
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে