পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

পিতা-মাতা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মায়ের গর্ভে সন্তানকে ধারণ করা থেকে শুরু করে তার বেড়ে

2026-09-09T13:57:20+00:00
2026-09-09T13:57:20+00:00
 
  বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৫৭ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
পিতা-মাতা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মায়ের গর্ভে সন্তানকে ধারণ করা থেকে শুরু করে তার বেড়ে ওঠা পর্যন্ত পিতা-মাতার ত্যাগের কোনো শেষ নেই। মা নিজের ঘুম, আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে লালন-পালন করেন; বাবা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে নিরলস পরিশ্রম করেন। তাই পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন শুধু সামাজিক বা নৈতিক কর্তব্য নয়; বরং এটি আল্লাহ তায়ালার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এবং একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন— তিনি ছাড়া তোমরা অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩)। এই আয়াত পিতা-মাতার মর্যাদা ও অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।

কোমল ভাষায় কথা বলা : পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে ইসলাম অত্যন্ত সতর্ক করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাদের ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩)। ‘উফ’ হলো বিরক্তি প্রকাশের সামান্যতম শব্দ। সেটিও যখন নিষিদ্ধ, তখন পিতা-মাতার সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলা, কটু কথা বলা, রাগ দেখানো কিংবা অপমান করা যে আরও গুরুতর অন্যায়— তা সহজেই বোঝা যায়। বর্তমান সময়ে সন্তানদের একটি বড় সমস্যা হলো— তারা বাইরের মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত ভদ্রভাবে কথা বললেও নিজের পিতা-মাতার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে। ইসলামের শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

Advertisement
বৈধ বিষয়ে আনুগত্য করা : পিতা-মাতার বৈধ নির্দেশ পালন করা সন্তানের দায়িত্ব। তবে তারা যদি আল্লাহর অবাধ্য কোনো কাজে নির্দেশ দেন, সে ক্ষেত্রে তা পালন করা যাবে না। কিন্তু মতভেদ হলেও তাদের সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে বাধ্য করে, যার কোনো জ্ঞান তোমার নেই, তা হলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে’ (সুরা লুকমান : ১৫)। ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্যেরও একটি সীমা রয়েছে। অন্যায় কাজে তাদের অনুসরণ করা যাবে না; কিন্তু তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করারও অনুমতি নেই। অর্থাৎ ধর্মীয় বিষয়ে আপস নয়, আবার পিতা-মাতার প্রতিও অশ্রদ্ধা নয়।

বার্ধক্যে সেবা-যত্ন করা : শৈশবে পিতা-মাতা যেভাবে সন্তানকে আগলে রাখেন, বার্ধক্যে তাদেরও তেমন যত্ন প্রয়োজন। তাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক দুর্বলতা, অসুস্থতা ও নির্ভরশীলতা বাড়তে থাকে। এ সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো সন্তানের অন্যতম বড় দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি তাদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসার সঙ্গে বিনয়ের ডানা অবনত করো’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৪)। নবীজি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পিতা-মাতার একজন অথবা উভয়কে বার্ধক্যে পেয়েও তাদের সেবা করে জান্নাত অর্জন করতে পারল না, সে অত্যন্ত হতভাগা’ (মুসলিম : ২৫৫১)। পিতা-মাতার বার্ধক্য সন্তানের জন্য বোঝা নয়; বরং তাদের সেবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহাসুযোগ।


ভরণপোষণ ও প্রয়োজন পূরণ : পিতা-মাতা অসচ্ছল, অসুস্থ কিংবা উপার্জনে অক্ষম হলে সামর্থ্যবান সন্তানের উচিত তাদের প্রয়োজন পূরণ করা। খাদ্য, চিকিৎসা, পোশাক, বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে তাদের পাশে থাকা সন্তানের দায়িত্ব। যে পিতা-মাতা নিজেদের প্রয়োজন উপেক্ষা করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, তাদের প্রয়োজনের সময় সন্তান যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তা অকৃতজ্ঞতার পরিচয়। সন্তানের উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা।

মায়ের প্রতি বিশেষ যত্ন : পিতা-মাতা উভয়ের অধিকারই মহান। তবে মায়ের গর্ভধারণ, প্রসব, দুধ পান করানো ও লালন-পালনের অসংখ্য কষ্টের কারণে তার প্রতি বিশেষ যত্নের কথা হাদিসে এসেছে। এক ব্যক্তি নবীজিকে জিগ্যেস করলেন, ‘আমার উত্তম সাহচর্যের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ নবীজি বললেন, ‘তোমার মা।’ এরপর আবার জিগ্যেস করলে তিনি, ‘তোমার মা।’

তৃতীয়বারও বললেন, ‘তোমার মা।’ এরপর জিগ্যেস করলে বললেন, ‘তোমার বাবা’ (বুখারি : ৫৯৭১)। এ হাদিস মায়ের বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে পিতার অধিকারও সুস্পষ্ট করেছে। তাই সন্তানের দায়িত্ব হলো— উভয়ের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও সেবা প্রদর্শন করা।

নিয়মিত দোয়া করা : পিতা-মাতার জীবদ্দশায় তাদের সুস্থতা, কল্যাণ ও দীর্ঘ নেক হায়াতের জন্য দোয়া করা উচিত। আর তারা ইন্তেকাল করলে তাদের মাগফিরাত ও রহমতের জন্য দোয়া করা সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা সন্তানদের একটি সুন্দর দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন— ‘হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৪)। এই দোয়ায় পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে। সন্তান যেন কখনো ভুলে না যায়— তার অসহায় শৈশবে পিতা-মাতাই তাকে আগলে রেখেছেন।

বর্তমান সময়ে অনেক সন্তান অর্থ-সম্পদ ও পেশাগত ব্যস্ততার কারণে পিতা-মাতার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনে উদাসীন হয়ে পড়ছে। কেউ অর্থ দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করেন, কেউ আবার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে একাকিত্বের মধ্যে রেখে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো— পিতা-মাতার সেবা ও সন্তুষ্টি অর্জনকে সৌভাগ্য মনে করা। যে মা সন্তানের অসুস্থতায় রাতের পর রাত জেগেছেন, যে বাবা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়েছেন— তাদের বার্ধক্যে অবহেলা করা কখনোই সন্তানের কৃতজ্ঞতার পরিচয় হতে পারে না। 


মনে রাখতে হবে, পিতা-মাতার বার্ধক্য সন্তানের জন্য বোঝা নয়; বরং তাদের সেবা করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ। আসুন, পিতা-মাতার জীবদ্দশাতেই তাদের মূল্য বুঝি; তাদের মুখে হাসি ফোটাই, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াই, ভালোবাসা দিয়ে তাদের হৃদয় জয় করি এবং তাদের দোয়া অর্জনের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার পথে এগিয়ে যাই। 

লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   পিতা  মাতা  সন্তান  কর্তব্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: