একটি সভ্যসমাজ কেবল যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত হয় না; অনেক সময় তা ভেঙে পড়ে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের অবক্ষয়ে। একজন ক্রেতা যখন বাজার থেকে মাছ, দুধ, ফল কিংবা শাকসবজি কিনে ঘরে ফেরেন, তখন তিনি শুধু একটি খাদ্যপণ্য কেনেন না; তিনি একজন ব্যবসায়ীর সততা, বাজারব্যবস্থার নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের তদারকির ওপরও আস্থা প্রকাশ করেন। এই আস্থাই অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান অদৃশ্য সম্পদ। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস প্রতারণার কাছে পরাজিত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ক্রেতা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনস্বাস্থ্য, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত অভিযানে এমন মাছ জব্দ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলোকে টাটকা ও আকর্ষণীয় দেখানোর জন্য শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত টেক্সটাইল রং ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাইরে উজ্জ্বল লালচে রং, ভেতরে পচন কিংবা নিম্নমান— এ দৃশ্য কেবল খাদ্যে ভেজালের নয়, এটি নৈতিক অবক্ষয়েরও একটি উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি। সামান্য অতিরিক্ত মুনাফার আশায় যদি মানুষের খাদ্যে এমন উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা তার স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, তবে তা নিছক অনিয়ম নয়; বরং আইন, নৈতিকতা এবং মানবিকতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ।
ইসলাম ব্যবসাকে কখনো শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি। ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা হলো ইবাদত, আমানত এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর কাছে ক্রেতার অর্থ যেমন আমানত, তেমনি তার জীবন ও স্বাস্থ্যও আমানত। তাই ব্যবসার ভিত্তি হতে হবে সততা, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহভীতি। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে তা হতে পারে’ (সুরা নিসা : ২৯)।
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় নেয়, কিন্তু যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজনে দেয়, তখন কম দেয়’ (সুরা মুতাফফিফিন : ১-৩)। পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না’ (সুরা বাকারা : ১৯৫)। এই আয়াতগুলোর শিক্ষা কেবল ওজনে কম দেওয়া বা সরাসরি প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তথ্য গোপন করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নত বলে উপস্থাপন করা কিংবা মানুষের অজান্তে ক্ষতিকর উপাদান খাদ্যে মিশিয়ে দেওয়া— এসবও একই নৈতিক অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।
নবীজি (সা.) নিজেও বাজার তদারকি করতেন। একদিন তিনি খাদ্যের একটি স্তূপে হাত দিয়ে ভেতরের অংশ ভেজা দেখতে পান। বিক্রেতা জানালেন, বৃষ্টির কারণে এমন হয়েছে। তখন তিনি বললেন, ‘তুমি ভেজা অংশটি ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ তা দেখতে পারে? যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়’ (মুসলিম : ১০২)। এই হাদিস ইসলামের ব্যবসায়িক নৈতিকতার এক অনন্য দলিল। পচা মাছকে রং দিয়ে টাটকা দেখানো, নিম্নমানের খাদ্যকে উন্নত বলে বিক্রি করা কিংবা খাদ্যের প্রকৃত অবস্থা গোপন করা— সবই এই হাদিসে নিন্দিত প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত।
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে’ (তিরমিজি)। এই হাদিস ব্যবসাকে কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে। একজন সৎ ব্যবসায়ী শুধু মানুষের আস্থা অর্জন করেন না, তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথও সুগম করেন। বিপরীতে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ সাময়িক লাভ এনে দিলেও তা ব্যক্তি, সমাজ এবং অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে অকল্যাণ বয়ে আনে।
ইসলামি ফিকহের একটি সুপরিচিত নীতি হলো, ‘আদ-দারারু ইউযাল’, অর্থাৎ ক্ষতি দূর করা আবশ্যক। একইভাবে শরিয়তের উচ্চতর উদ্দেশ্যগুলোর (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) অন্যতম হলো মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা। যে কোনো কর্মকাণ্ড মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য বা সম্পদকে অযৌক্তিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, তা এই মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। ইসলামের ইতিহাসে বাজার তদারকির জন্য হিসবাহ নামে একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান ছিল। রাষ্ট্রনিযুক্ত মুহতাসিব বাজারে ঘুরে পণ্যের মান, ওজন, পরিচ্ছন্নতা ও লেনদেনের স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণ করতেন। কোথাও প্রতারণা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল কেবল অপরাধ দমন নয়; বরং মানুষের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং বাজারের শুদ্ধতা রক্ষা করা।
এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়— কোনো বাজার কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠে না; তার জন্য প্রয়োজন নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং আমানতদারিতার সংস্কৃতি। যখন এই তিনটি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কৃত্রিম রঙে ঢেকে রাখা একটি মাছ আসলে পুরো সমাজের নৈতিক সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করি— যেখানে খাদ্যে বিষ নয়, থাকবে নিরাপত্তা; ব্যবসায় প্রতারণা নয়, থাকবে সততা; আর বাজারের প্রতিটি লেনদেন পরিচালিত হবে আমানত, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির চেতনায়।
আলেম ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি