ভোগস্বত্ব রেখে দান, কী বলে ইসলাম

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

ইসলাম

সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে অনেক বাবা-মা সন্তানের কাছে অবহেলার শিকার হন। এই বাস্তবতা থেকেই ২০২৬ সালে সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর

2026-09-11T10:24:41+00:00
2026-09-11T10:24:41+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
ভোগস্বত্ব রেখে দান, কী বলে ইসলাম
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে অনেক বাবা-মা সন্তানের কাছে অবহেলার শিকার হন। এই বাস্তবতা থেকেই ২০২৬ সালে সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন একটি ধারা যুক্ত করেছে। আইন বলছে, কোনো ব্যক্তি তার সন্তানকে সম্পত্তি দান করতে পারবে, তবে শর্ত থাকবে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি নিজেই ভোগ করবে। দানপত্র রেজিস্ট্রি হয়ে যাবে, কিন্তু দখল যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এই ধরনের দান কতটা গ্রহণযোগ্য? ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দানকে হেবা বলা হয়। হেবা সম্পর্কে হাদিসে স্পষ্ট মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। 

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করো’ (বুখারি : ২৫৮৭)। এই ইনসাফের অংশ হিসেবেই সাহাবায়ে কেরাম জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পদ দান করতেন। ফকিহগণ হেবা সহিহ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। দাতার ইচ্ছা, গ্রহীতার কবুল এবং কবজা তথা দখল হস্তান্তর। ইমাম নববী (রহ.) ‘আল-মাজমু’ কিতাবে লিখেছেন, কব্জা ছাড়া হেবা পূর্ণ হয় না।

এই কবজা শর্তের কারণেই নতুন ভোগস্বত্ব রেখে দান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। যারা একে নাজায়েজ বলছেন তাদের মূল দলিল হলো, দাতা যদি নিজেই সারাজীবন ভোগ করতে থাকে তা হলে গ্রহীতার কবজা সাব্যস্ত হয় না। ফলে এটি হেবা থাকে না, বরং এটি মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়া অসিয়তের মতো হয়ে যায়। আর অসিয়ত সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে, সে যদি কিছু সম্পদ রেখে যায়, তবে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়সংগতভাবে অসিয়ত করে যাবে’ (সুরা বাকারা : ১৮০)। 

হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করার অনুমতি দিয়েছেন’ (আবু দাউদ : ২৮৬৫)। অর্থাৎ অসিয়ত সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ। আর ‘লা অসিয়াতা লিওয়ারিস’ অর্থাৎ ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত নেই (তিরমিজি : ২১২০)। তাই যারা বিরোধিতা করছেন তারা বলছেন, এই আইন দিয়ে কৌশলে মিরাসের বিধানকে ফাঁকি দেওয়া হতে পারে। কুরআনে আল্লাহ নিজে মিরাসের অংশ ভাগ করে দিয়েছেন। সেখানে হস্তক্ষেপ করা ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।


আবার যারা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ বলছেন তারা চুক্তি পূর্ণ করার কুরআনের নির্দেশকে সামনে আনছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো’ (সুরা মায়েদা : ১)। তাদের যুক্তি হলো, এটি হেবা না, বরং হিবা বি-শারত বা শর্তযুক্ত দান। দাতা শর্ত দিল আমি জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগ করব এবং প্রাপ্তবয়স্ক গ্রহীতা যদি তা জেনেবুঝে রাজি হয়, তা হলে সেই চুক্তি পালন করা ওয়াজিব। ফিকহে আরিয়া ও হিবা মুয়াল্লাকা এর নজির আছে। তারা আরও বলেন, ইসলামের অন্যতম মাকসাদ হলো হিফজুল মাল তথা সম্পদ ও হিফজুন নাফস তথা জীবন রক্ষা করা। 

বর্তমানে বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের জুলুমের শিকার হন। তাদের সুরক্ষা দেওয়া শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যায়। এই কারণেই দেশের জ্যেষ্ঠ মুফতিগণ দুটি পরামর্শ দিচ্ছেন— প্রথমত সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো সরাসরি হেবা করে কবজা বুঝিয়ে দেওয়া। কারণ নবীজি (সা.) নুমান বিন বশির (রা.)-এর ঘটনায় বলেছিলেন, ‘তুমি কি সব সন্তানকে সমান দিয়েছ?’ তিনি ‘না’ বললে নবীজি (সা.) বললেন, ‘তা হলে ফেরত নাও’ (বুখারি : ২৫৮৭)। এখান থেকে বোঝা যায় ইনসাফ ও কবজা দুটোই জরুরি। দ্বিতীয়ত যদি কেউ সত্যিই নিরাপত্তার কারণে এই নতুন পদ্ধতি নিতে চায়, তা হলে তিনটি শর্ত মানতে হবে। এক. কোনো জোর-জবরদস্তি না থাকা। দুই. গ্রহীতার পূর্ণ সম্মতি থাকা। তিন. অন্য ওয়ারিশদের হক নষ্ট করার নিয়ত না থাকা। নিয়ত যদি হয় মিরাস ফাঁকি দেওয়া, তা হলে তা হারাম হবে। কারণ আল্লাহ বলেন, ‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (সুরা নিসা : ১৩)

হেবা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ লেনদেন লিখে রাখার নির্দেশ কুরআনেই আছে কিন্তু ভোগস্বত্ব রেখে দান নিয়ে ফিকহি মতভেদ আছে। তাই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই স্থানীয় বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সম্পত্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখেরাত চিরস্থায়ী। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল ও ইনসাফের সঙ্গে জীবনযাপনের তওফিক দিন।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 


  বিষয়:   ভোগস্বত্ব  ইসলাম 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: